ভিসার নাম ভালবাসা

সমরেশ মজুমদার



পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনাসের গায়েই ফর্টি সেকেন্ড স্ট্রিটের রেল স্টেশন। অ্যাটালান্টিক সিটিতে সারা দুপুর কাটিয়ে নব্বই ডলার হেরে বাসে চেপে ফিরে এসেছিল রামানন্দ। বারো ঘন্টার আসা-যাওয়ার জন্যে বাসের টিকিট কাটতে গায়ে লাগে না কারণ নামার পরই ওই অঙ্কের কুপন দেওয়া হয় জুয়ো খেলার জন্যে। আজ প্রায় আড়াইশো ডলার জিতেছিল সে, কিন্তু লোভই কাল হল। সেটা খেয়ে নিয়ে স্লট মেশিন খুশী হল না, পকেটের নব্বই ডলারও গিলে ফেলল। ফেরার পথে কেবলই মনে হচ্ছিল, প্রায় চার হাজার পঞ্চাশ টাকা নষ্ট করার গল্প দেশে ফিরে গিয়ে কাউকে বলা যাবে না।
রামানন্দ নিউইয়র্কে এসেছিল একটা সেমিনারে যোগ দিতে। আসা- যাওয়ার প্লেনভাড়া লাগেনি। দুদিন সেমিনারের আতিথ্য নে‍ওয়ার পর সে চলে এসেছিল কুইন্সের ইউনিয়ন টার্নপাইকের এক বন্ধুর বাড়িতে। বন্ধু ব্যস্ত মানুষ। সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যার ফেরে। তাতে কোনও অসুবিধা হয়না রামানন্দর। শহরটাকে সে মোটামুটি চেনে।
আজ প্ল্যাটফর্ম একদম ফাঁকা, ছুটির দিনে কেউ সন্ধের পরে বোধহয় এই অঞ্চলে দরকার না পড়লেও আসে না। ট্রেনও চলাচল করে একটু সমায়ের ব্যবধান বাড়িয়ে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতেই রামানন্দ লোকটাকে দেখতে পেল। খাটো চেহারা, বেশ রোগা, চোখে চশমা, মাথায় কাঁচাপাকা চুল, বগলে একটা জীর্ন চামড়ার ব্যাগ। পরণের জামাটাও বিবর্ন। লোকটাকে দেখামাত্র হরিপদ কেরানির কথা মনে এসে গেল। পশ্চিমবাংলার শহরে শহরে এইরকম চেহারার অনেক মানুষ ছড়িয়ে আছেন যাঁরা ভাগ্যের কাছে হেরে গিয়ে বাঁচার জন্যে বাঁচছেন। সে লক্ষ করল মানুষটা চারপাশে তাকাচ্ছে বেশ দুর্বল চোখে। চামড়ার রং বলছে ইনি সাদা আমেরিকান। লোকটির সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে হল রামানন্দর। লোকটি যদি কেতাদুরস্ত এবং সচ্ছল চেহারায় হত তাহলে ইচ্ছেটা হত না। বেশির ভাগ আমেরিকানের ইংরেজি উচ্চারণ সে বুঝতে পারে না। তাই বাধ্য না হলে কথা বলে না।
সে কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘ইউনিয়ন টার্নপাইকের ট্রেন এখানেই পাব তো?’
লোকটি মুখ তুলে তাকে দেখল। চশমার কাচের তলায় চোখ কুঁচকে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপর মাথা নেড়ে পরিষ্কার ইংরেজিতে  বলল,  তাই তো পাওয়া উচিত?’
‘আমি তো বাসের রাস্তা চিনি না, ট্রেনই ভরসা।’ রামানন্দ বলল।
লোকটা কোনও কথা না বলে দাঁড়িয়ে থাকল।
‘এখন ইন্ডিয়াতেও মাটির তলায় ট্রেন চলছে।’ কথা খুঁজল রামানন্দ।
‘ইন্ডিয়া!’
হ্যাঁ, পৃথিবীতে ইন্ডিয়া নামে একটা দেশ আছে। আমার দেশ।’
লোকটা হাসল, ‘আমি  জানি। অবশ্য এদেশের অনেক মানুষ জানে না। ইন্ডিয়া যার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা। কেন যে ওরা ওঁকে মেরে ফেলল! বেশ জোরে শ্বাস ফেলল লোকটি।
খুব অবাক হয় গিয়েছিল রামানন্দ। ঠিক তখনই ট্রেন এসে গেল। দরজা খুলতেই ভেতরের খালি বেঞ্চির একটাতে বসতেই সে লোকটিকে দেখতে পেল। ট্রেনে উঠে এপাশ-ওপাশ দেখছে রামানন্দ হাসল, মাথা নেড়ে তার দিকে আসতে বলল। লোকটি গুটিগুটি তার পাশে বসতেই ট্রেন চালু হল। কলকাতায় পাতাল রেল চললে ভেতরে বসে কথা বলা যায় না ভয়ঙ্কর আওয়াজের জন্য। এখানে এরা শব্দটাকে মেরে রেখেচ্ছে।
রামানন্দ জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাম জানতে পারি?’
লোকটি মাথা নাড়ল, ‘আমি হ্যারি।’
‘আমি রামানন্দ।’ আপনি রাম বলতে পারেন,’ বলেই তার বেশ মজা লাগল।
যাকে সে হরিপদ বলে ভেবেছিল তার আসল নাম টম ডিক অ্যান্ড উইলি যা হোক একটা হতে পারত, হ্যারি কেন হল? হ্যারি আর হরিপদ একদম কাছাকাছি।
সে জিজ্ঞেস করল, ‘আজ তো ছুটির দিন। বেড়াতে বেরিয়েছিলেন?’
মাথা নাড়ল হ্যারি, না। ‘এই সপ্তাহের কাজ কিছু বাকি ছিল, তা শেষ করে এলাম।’
‘ওভারটাইম কাজ করলে নিশ্চয়ই বেশি রোজগার হবে?’
‘না! আজ না গেলে মাইনের টাকা থেকে পেনাল্টি হিসেবে খানিকটা কেটে নিত! কেন সপ্তাহের কোটা আমি সপ্তাহে শেষ করিনি?’ বলেই হ্যারি তাকাল, ‘আপনাদের দেশে এই ব্যবস্থা নেই?’
‘না। কাজ শেষ না করার জন্য কাউকে পেনাল্টি দিতে হয় না। বরং ছুটির দিনে কাজ করলে এক্সট্রা রোজগার হয়।’ রামানন্দ বলল।
‘আমি একজন এ্যাকাউন্টেন্ট। অ্যাকাউন্টেন্সি খুব ভাল জানি, কিন্তু এখানে যা রোজগার করি তাতে খরচ চালাতে পারছি না। খুব কষ্টের মধ্যে আছি। বেশ জোরে শ্বাস ফেলল হ্যারি।
চমকে উঠল রামানন্দ। একজন আমেরিকান যে এ্যাকাউটেন্সি খুব ভাল জানে, কী কথা বলছে? চেহারা এবং পোশাকে অবশ্যই এই কথার সমর্থন আছে। কিন্তু এমন হতে পারে লোকটা কোনও কাজই জানে না এবং করে না, সরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। ইদানীং সেই সাহায্যের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি করছেন ওবামা সরকার, তাই এই লোকটা বানানো গল্প বলছে।
হ্যারি জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাদের দেশে বাড়িতে রান্না করে খেলে একটা মানুষের কীরকম খরচ হয়?’
‘কী খাবে তার ওপর নির্ভর করছে?’
হ্যারি তার কাঁচাপাকা চুলে আঙুল বুলিয়ে ঢুকিয়ে ভাবল। তারপর বলল, ‘ধরো, সকালে এক কাপ চা, ব্রেকফাস্টে একটা বয়েলড এগ অথবা ওমলেট আর দুপিস ব্রেড, দুপুরে দুটো স্যান্ডউইচ আর রাত্রে- থেমে গেল হ্যারি।
‘হ্যাঁ, বলো।’
‘রাত্রে আমি একটু ভাল খেতে চাই। রাইস, ভেজিটেবল আর দুটুকরো মাংস দিয়ে অনেকখানি ঝোল। সব একসঙ্গে। এখন শুধু ভেজিটেবল স্টু খাচ্ছি।’
রামানন্দ হিসেব করে বলল, ‘খুব বেশি হলে ফিফটি সেন্ট।,
‘অ্যাঁ?’ চমকে উঠল হ্যারি, ‘কি বলছ তুমি?’
‘ঠিকই বলছি।’
‘মাই গড!’ চোখ বন্ধ করল হ্যারি, তারপর জিজ্ঞেসা করল, ‘একটা ওয়ান বেডরুম ফ্ল্যাট ভদ্র এলাকায় কী রকম ভাড়ায় পাওয়া যায়?’
‘মফসসলে অনেক কম, কলকাতায় মাসে একশো ডলার।’
‘কী বলছ রাম, এ তো স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে।’
‘ভারতবর্ষে এটাই সত্যি।’
‘তুমি এখানে আর কতদিন আছ?’
‘আছি। ধরো, দিনসাতেক।’
নামবার আগে বন্ধুর দেওয়া মোবাইলের নাম্বার দিতে হল হ্যারিকে, হ্যারি বলল, ‘আমি যদি তোমাকে ফোন করি তাহলে বিরক্ত হবে না তো?’
‘বিন্দুমাত্র না।’ ইউনিয়ন টার্নপাইক স্টেশনে নেমে পড়ল রামানন্দ।
স্টেশন থেকে বন্ধুর বাড়িতে পৌঁছতে মিনিট বারো হাঁটতে হয়। ছবির মতো রাস্তা। তবে লোকজন নেই। মাঝে মাঝে গাড়ি যাচ্ছে জোর গতিতে। মাঝপথে ডান দিকে একটা কবরখানা পড়ে, বন্ধুর সঙ্গে একদিন গিয়েছিল ভেতরে। প্রচুর গাছগাছালির মধ্যে অজস্র মৃতমানুষকে নিয়ে রয়েছে ফলকগুলো। বন্ধু হেসে বলেছিল, ‘এখন এইরকম দেখছ, মাঝরাত্রে ওঁরা কবর থেকে বেরিয়ে এসে গল্প করেন।,
রামানন্দ জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাঃ! গল্পের সাবজেক্ট কী?

বন্ধু বলেছিল, এক বৃদ্ধ সদ্য আসা একজন প্রৌঢ়কে জিজ্ঞেস করবে, ওহে এখন গ্যাসের দাম কত হয়েছে?
প্রৌঢ় পাল্টা জিজ্ঞেস করবে, ‘এখানে আসার আগে কত দেখে এসেছিলেন?’
বৃদ্ধ বলবেন, ‘বেড়েছিল গ্যালনে ষাট থেকে সত্তর হয়েছিল।’
প্রৌঢ় হাসবে, ‘এখন এক গ্যালনের দাম চার ডলার নব্বই সেন্ট।’
শোনামাত্র বৃদ্ধ তাঁর কবরে ফিরে যাবেন। সেখানে গ্যাসের দরকার হয় না।
সঙ্গে সঙ্গে হ্যারির মুখ মনে পড়ল। লোকটার যে গাড়ি নেই তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। কিন্তু একজন আমেরিকান কলকাতার   বাজারার শুনে স্বপ্ন বলে ভাবছেন একথা দেশের বন্ধুরাও বিশ্বাস করতে চাইবে না।

ঠিক দুদিন পরে হ্যারির ফোন এল। রামানন্দ তখন ইলিশের আঁশ ছাড়াচ্ছে। জ্যাকসন হাইটের এক বাংলাদেশির দোকানে ইলিশের দাম পাউন্ড প্রতি বারো ডলার। দুই পাউন্ড মানে আট ডলার, দেশের টাকায় তিনশো ষাট টাকা। আসার আগে মানিকতলা বাজারে গিয়ে শুনেছিল ইলিশ পাঁচশো টাকা কেজি, আর নিউইয়র্কে সে এককেজি কিনেছে তিনশো ষাট ভারতীয় টাকায়। কেনার সময় পাথরের চেয়ে শক্ত ছিল মাছটা, মাছওয়ালা বলেছিল, ‘দশ মিনিট পানিতে রাখলে দেখবেন কী হয়।’ সত্যি একদম টাটকা মাছ হয়ে গেল যেন। সেই মাছের আঁশ ছাড়াবার সময় ফোনটা বাজল।
‘হ্যালো!’ রামানন্দ জানান দিল,
‘মিস্টার রাম?’ হ্যারির গলা।,
‘হ্যাঁ! মিস্টার হরিপদ, আই থিঙ্ক, মিস্টার হ্যারি?’
‘কী আশ্চর্য! আপনি আমাকে চিনতে পারলেন?’
‘নিশ্চয়ই! বলুন, কী করতে পারি?
‘আপনার সঙ্গে দেখা করে একটু কথা বলা যাবে?’
‘কোথায় দেখা করলে আপনার সুবিধা হয়, বলুন।’
‘আমরা এখন ইউনিয়ন টার্নপাইক স্টেশনের সামনে আছি।’
‘আপনারা মানে?’
‘আমি আর আমার স্ত্রী।’
‘ওহো! ওখান থেকে আমি যেখানে থাকি সেখানে হেঁটে এলে বারো মিনিট লাগবে। চলে আসুন।’ বাড়ির নাম্বারন রাস্তার নাম বলে দিল  রামানন্দ।
ইলিশ মাছের ভাপে ভাপে করা খুব সহজ। গোটা ছয়েক টুকরো ভাপেতে বসিয়ে দিয়ে সাবানে হাত ধুতেই নিচে বেল বাজল।
নিচে নেমে দরজা খুলতেই হ্যারি বলল, ‘গুড মর্নিং। ইনি আমার স্ত্রী এলিজাবেথ।,
এলিজাবেথ মাথা নেড়ে বললেন, ‘গুড মর্নিং।’
‘মর্নিং। আসুন ওপরে চলে আসুন আমার সঙ্গে।’ দরজা বন্ধ করে ওপরের বসার ঘরে নিয়ে এসে ওদের বসতে বলল রামানন্দ।
এলিজাবেথকে হ্যারির সমবয়সি বলে মনে হচ্ছে, বেশ রোগা কিন্তু চুল এখনও পাকেনি। চোখে চশমা, হাতের ব্যাগটি বেশ বড়। পরনে পা ঢাকা স্কার্ট।
‘রাম। একটু ঝুঁকে বসল হ্যারি, ‘লিজের সঙ্গে হ্যারি আমি আলোচনা করে দেখলাম।
আমরা তোমাদের দেশে গিয়ে থাকতে চাই। আমি ভাল অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্প্যুটার ব্যবহার করছি বহু বছর ধরে। তুমি কি আমাদের সাহায্য করতে পারবে?’
এতটা ভাবেনি রামানন্দ, ‘তোমরা আমেরিকান হওয়া সত্ত্বেও ইন্ডিয়াতে গিয়ে থাকবে?
উত্তর দিল এলিজাবেথ, ‘এই দুইদিন আমরা ইন্ডিয়া সম্পর্কে অনেক খবর নিয়েছি। একজন ইটালিয়ান মহিলা এখন ইন্ডিয়ার সবচেয়ে বড় পার্টির প্রেসিডেন্ট। তিনি যদি থাকতে পারেন তাহলে আমরা কেন পারব না?’
‘কিন্তু কেন আমেরিকায় থাকতে চাইছ না?’
‘আমি আড়াই হাজার ডলার মাইনে পাই। আড়াই শো ডলার কোম্পানিতে  নানান খাতে কেটে নেয়। বাড়িভাড়া দিতে হয় নয়শো ডলার। তারপর ইন্সিওরেন্স কোম্পানিকে প্রতিমাসে পেমেন্ট করতে হয়। আমার ছেলে মরে গিয়েছে। তার চার বছরের বাচ্চা আমাদের কাছে আছে। ওর মা আর একজনকে  বিয়ে করে চলে গেছে। আগে জিনিসপত্রের দাম কম ছিল। কোনওরকমে ম্যানেজ করতাম। নাতির স্কুলের ফিস দেওয়ার পরে চোখে অন্ধকার দেখছি। তুমি ইন্ডিয়ার কথা যা বলেছিলে তাতে আমাদের মনে হয়েছে বাকি জীবনটা ভাল ভাবে বাঁচতে পারব।’ হ্যারি বলল।
রামানন্দ বলল, ‘কিন্তু ইন্ডিয়ার আর কিছু তোমরা জানো না ।’
এলিজাবেথ মাথা নাড়ল, ‘শুনেছি’ অনেক মানুষ সেখানে। কোনও ডিসিপ্লিন নেই। রাস্তাঘাট পরিষ্কার নয়। গ্রামের দিকে মেডিক্যাল ফেসিলিটিস নেই। কিন্তু ওখানকার মানুষদের মন খুব ভাল। জিনিসপত্রের দাম যতই বারুক আমেরিকার তুলনায় কিছুই নয়, শুনেছি পাঁচ-ছয় সেন্টে এক কাপ চা পাওয়া যায়।’
‘কিন্তু ওখানে তোমরা ডলারে রোজগার করবে না।’
‘আমাদের আড়াইজনের থাকা-খাওয়ার জন্যে কত খরচ হবে ওখানে?’
‘পঁচিশ হাজার। মানে সাড়ে পাঁচশো, সাড়ে পাঁচশো ডলার।’
হ্যারি হাসল, ‘তাহলে কোনও চিন্তাই নেই, আমি চাকরি ছেড়ে দিলে অফিস আমাকে মাসে বারোশো ডলার পেনশন দেবে। তাহলে চারশো ডলার বেঁচে যাবে। আমার ওখানে একটু নিরিবিলি জায়গায় থাকতে চাই। বড় শহরেই।
‘কিন্তু ইন্ডিয়াতে যাবে কী করে?’
হ্যারি হাসল, ‘প্লেনের ভাড়া আমরা জোগাড় করে নেব।’
‘না না। ইন্ডিয়াতে ঢুকতে তো ভিসা লাগবে?’
এলিজাবেথ অবাক হল, ‘আমেরিকানদের কি ভিসা দরকার হয়?’
‘ইন্ডিয়া তো কানাডা নয়? অবশ্য দরকার হবে।’
‘ঠিক আছে, আমরা ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করব।’
‘বেশ! অ্যাপ্লাই করলে তোমাদের ট্যুরিস্ট হিসেবে তিন মাস বা  ছয় মাসের ভিসা দেবে ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট। সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে চলে আসতে হবে। নইলে আইন তোমাদের বিরুদ্ধে যাবে।’ রামানন্দ বলল।
স্বামী স্ত্রীর দিকে তাকাল। এলিজাবেথ কাতর গলায় রামানন্দকে বলল, ‘শুনেছি ইন্ডিয়া অহিংসায় বিশ্বাস করে। ইন্ডিয়ানদের মন খুব বড়, আমরা যদি ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্টের কাছে অ্যাপিল করি, আমাদের থাকতে দাও, তাহলে কি দেবে না?’
রামানন্দ কী বলবে বুঝতে পারছিল না। এলিজাবেথ তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে বলল, ‘অ্যাপিল নিশ্চয়ই করতে পারেন, তবে ওখানে গিয়ে করার চেয়ে যাওয়ার আগে করা ভাল।,
হ্যারি বলল, ‘শুনেছি ইন্ডিয়াতে কয়েক কোটি মানুষ থাকে। আরও তিনজন যদি যোগ হয় তাহলে কী এমন তফাত হবে।
রামানন্দ হেসে ফেলল। ‘ঠিকই! আচ্ছা, আমি আমার প্রিয় মাছ রান্না করেছি। আসুন একসঙ্গে মাছভাত খাই।’
‘ক্যাট ফিস?’ এলিজাবেথ জিজ্ঞেস করল।
‘না ইলিশ! অনেকটা আপনাদের সার্ডিন মাছের মতো।’
‘কাঁটা আছে?’ হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ, আছে। কিন্তু স্বাদ অতুলনীয়।’
‘সরি রাম, আমি কাঁটাওয়ালা মাছ খেতে পারি না।,
‘আমিও।’ বলল এলিজাবেথ। তোমরা কি খুব মাছ খাও?’
‘হ্যাঁ! তবে নিরামিষ খেতে অনেকে পছন্দ করেন।’ রামানন্দ উঠে দাঁড়াল, ‘ঠিক আছে, কাল রাত্রে চিকেন করেছিলাম?, তাই দিচ্ছি ভাতের সঙ্গে।’

এলিজাবেথ বলল, ‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু আমরা এখানে খেতে পারব না। আমার নাতি এখন একা বাড়িতে আছে। ফিরে গিয়ে স্যান্ডউইচ বানিয়ে তিনজনে একসঙ্গে খাব।’
‘একটু দাঁড়াও।’
রান্নাঘরে গিয়ে একটা বড় প্ল্যাস্টিকের কৌটোয় অনেকটা ভাত, মুরগির মাংস ঝোল সমেত সযত্নে আর একটাতে ঢেলে ক্যারিব্যাগে ভরে নিয়ে এল সে, ‘এইটা নিয়ে যাও প্লিজ! তোমাদের তিনজনের হয়ে যাবে।’
‘কী আশ্চর্য! কেন?’ এলিজাবেথ উঠে দাঁড়াল।
‘আজ আমি ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাব আর তোমাদের নাতি শুকনো স্যান্ডউইচ চিবোবে, খুব খারাপ লাগবে আমার।’
ক্যারিব্যাগটা হাতে নিয়ে এলিজাবেথ বলল, ‘রাম, আমরা এই পৃথিবীটাকে অনেক ভাগে ভাগ করে যে যার দখলে রেখেছি। কাউকে অন্য ভাগকে নিজের ভাগ ?? ভাবতে দিই না, অ্যাপিল করলেও ওরা দয়া করবে কি না জানি না, কিন্তু মানুষের মনে কোনও ভাগাভাগি নেই, সেখানে পৌঁছতে পাশপোর্ট বা ভিসার দরকার হয় না।’
হ্যারি বলল, ‘ভুল বললে। হয়। সেই ভিসার নাম ভালবাসা। বাই রাম! তোমাকে আমাদের মনে থাকবে।’
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দুই প্রৌঢ়-প্রৌঢ়াকে ক্যারিব্যাগ হাতে হেঁটে যেতে দেখল রামানন্দ। আজ দুপুরে ওরা তিনজন নিশ্চয়ই খেয়ে তৃপ্তি পাবে।

মন্তব্য

10/05/2011 - 08:26
By dipannita.dutta

Wonderful Story. Thank you Samaresh Babu,
Dipannita Dutta, Sujoy Lahiri
Washington DC

10/06/2011 - 20:49
By saikat sen

ভালো, তবে হালকা।