একটুখানি ঘুমের চটকা এসেছিল, একটা শব্দ শুনে মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন হ্যামিল্টন সাহেব। হেঁড়ে গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কেডা? কে ওহানে?
অনেকখানি লম্বা ও চওড়া বারান্দা। ওপরে ছাউনি দেওয়া। এখন অন্ধকার। একটা ঝোলানো লন্ঠন আছে, সেটা আজ জ্বালানো হয়েছিল কি হয়নি, তা সাহেবের খেয়াল নেই। কোনো উত্তর না পেয়ে হ্যামিল্টন পাশে হাত বাড়িয়ে গেলাসটা খুঁজলেন। পাশাপাশি দুটি আরামকেদারা। মাঝখানে একটা ছোটো তেপায়ায় রাখা থাকে তাঁর গেলাস, মদের বোতল ও জলের পাত্র। এখান থেকেই দেখা যায় গড়াই নদী, অন্ধকারেও দু-একটা নৌকোর বিন্দু বিন্দু কুপির আলো। জোৎস্না রাতে চকচক করে নদীর জল। হাত বাড়িয়ে গেলাসটা পেলেন সাহেব। সেটা খালি। মদের বোতলটি নিঃশেষ, একটু তলানিও নেই। তাঁর মেজাজ বিগড়ে গেল। পেছনে দরজার কাছে আর একবার শব্দ হতেই সাহেব হুংকার দিয়ে বললেন, কে রে? সাড়া দিস না ক্যান, অ্যাঁ?
উত্তর নেই। তবে বুঝি বাতাসের শব্দ। খুব জোরে হাওয়া উঠলে এই নদীতীরের দোতলা বাংলো বাড়িটাকে মনে হয় ঠিক জাহাজের মতন। যেন একটু একটু দোলে। তৃতীয়বার শব্দটা হতেই পরিষ্কার বোঝা গেল, তা প্রাকৃতিক হতে পারে না, নিশ্চিত কোনো জীবিত প্রাণীর।
সাহেবের পায়ের কাছে সবসময় রাখা থাকে তাঁর বন্দুক। কোম্পানির লোকেরা এই বাংলো দখল করবে বলে হুমকি দিয়ে রেখেছে। সাহেবকে তাই সদাসতর্ক থাকতে হয়। বন্দুকটা হাতে নিয়ে সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। সারাদিনের নেশায় তাঁর সারা শরীরে টলটলায়মান ভাব, তবু এগোতে এগোতে তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বলতে লাগলেন, হালা পুঙ্গির পুত, বাস্টার্ড, মাদার...এক গুলিতে খতম করে দেব। আমারে মারতে আইছস? তোর বউ আইজই বিধবা হইব!
নেশার ঝোঁকে সাহেবের খেয়ালই হল না যে কোনো আততায়ী এলে সে আড়াল থেকে শব্দ করবে কেন? পেছনের ঘরটার পর্দা সরাতেই প্রথমে দেখা গেল দুটো জ্বলজ্বলে চোখ। খুব নিচুতে। অর্থাৎ কোনো বড় প্রাণী নয়। তারপর বোঝা গেল, সেটা একটা বেড়াল। বেড়ালটা আবার একটা ইঁদুর কামড়ে ধরেছে। ইঁদুরটা এখনো জ্যান্ত, বেড়ালটা সেটাকে মেঝেতে ঠুকে ঠুকে মারার চেষ্টা করছে।বেড়ালটা কিন্তু সাহেবকে দেখেও ভয়ে পালাবার চেষ্টা করল না। তার মুখের গেরাসটা ফেলে রেখে সে যেতে রাজি নয়।
সাহেব একেবারে বেড়াল সহ্য করতে পারেন না। বেড়াল দেখলেই তাঁর ঘেন্না হয়।এ বাড়িতে অনেক ইঁদুর আছে। নদীর ধারে বাড়ি, ইঁদুর তো থাকবেই। দিনের বেলাতেও ইঁদুরদের দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা যায়, সাহেবের খারাপ লাগে না। অনেক সময় সাহেবের পায়ের ওপর দিয়েও এক-একটা দৌড়ে যায়, তারা তো কামড়ায় না কিংবা ক্ষতি করে না কিছু। তাঁর বাড়ির ইঁদুর বাইরের বেড়াল মারতে আসবে কেন? এই হুলো বেড়ালটা প্রায়ই ঢুকে পড়ে।সাহেব দু-চারবার হুট-হ্যাট বললেও নড়ল না বেড়ালটা। একটা বেড়ালকে গুলি করে মারলে সেটা বড্ড বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পড়ে যায়। হ্যামিল্টন তবু বন্দুক তুলে বাইরের দিকে তাক করে একবার ফায়ার করলেন। সেই আওয়াজে বেড়ালটা ল্যাজ তুলে পালাল পড়িমরি করে। প্রতিদিন অন্তত একবার অপ্রয়োজনেও সাহেবের ফায়ার করা চাই। এই শব্দটা তাঁর ভালো লাগে। তা ছাড়া আশেপাশের মানুষের ওপর তাঁর আধিপত্য এখনো জারি করা যায়। নীলকুঠির ফ্রেজিয়ার সাহেব ছাড়া এ তল্লাটে আর কারুর বন্দুক নেই। ফায়ারিং-এর শব্দ শুনে কাশেম হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল।
কী হইছে সাহেব? কারে মারলেন?
একটু দূরে এসে দাঁড়িয়েছে কাশেম। সাহেব তাঁর আরদালিকে বললেন, কাছে আয়, কাছে আয়।

কাশেম কাছে আসতেই হ্যামিল্টন খপ করে তার একটা কান ধরে মুচড়ে দিতে দিতে বললেন, হারামজাদা, শ্যাখের পো, নিমকহারাম, ডিউটিতে ফাঁকি দ্যাস! আমার বাড়িতে বিড়াল ঢোকে ক্যামনে? দ্যাখতে পারস না?
কাশেম হাসতে হাসতে বলল, ছাড়েন, ছাড়েন, লাগে। বিলাই ঢুকে পাকের ঘরের জানলা দিয়া। সেহান তো ফইটকা বইস্যা থাকে। তার দেখনের কথা। কান ছেড়ে দিয়ে সাহেব বললেন, চোপ! ফটিকের কাজ রান্না করা আর তর ডিউটি বাড়ি পাহারা দেওয়া আর আমার খিদমদগারি। আমার যে বোতল ফুরাইছে, তা কে দ্যাখব? লন্ঠনডা জ্বালাইস নাই ক্যান?
আরো বোতল তো ঘরেই আছে সাহেব।
ফের মুখে মুখে কথা? লাথথি খাবি! ঘরেই থাক আর দোকানেই থাক, আমার চেয়ারের পাশে সবসময় বোতল মজুত রাখা তার ডিউটি।এহনি দিতাসি সাহেব। মাফ করেন। হ্যামিল্টন আবার এসে নিজের আর্মচেয়ারে বসলেন। কাশেম বোতল এনে, তার থেকে গেলাসে কিছুটা ঢেলে, পানি মিশিয়ে সাহেবের হাতে দিল। তারপর বললো, ফইটকা পুছ করতাছিল, রাত্তিরে কী খাইবেন?
খামু তোর মাথা। কী দিতে পারবি?
আপনে যা ইচ্ছা করেন। ইচ্ছা করলেই দিতে পারবি? আমার তো ইচ্ছা করে ইয়র্কশায়ার পুডিং খাইতে। পারবি দিতে?
ওই বস্তুর কথা তো কিছু জানি না। ফইটকারে কমু।
ফইটকা বোঝাবে কচু। বাড়িতে দুধ আসে? কিশমিশ আসে? ফটিকরে ক পায়েস বানাইতে। ইয়র্কশায়ার পুডিং-এর বদলে হেইডা হবে কুমারখালি পুডিং।..তোর ছুটো পোলাডা আইজ কেমন আছে?
ভালো না সাহেব। জ্বর ছাড়ে নাই।
শীত করে? কাঁপুনি দেয়?
না কর্তা। জ্বরে একেবারে শরীল পোড়ায়। হাত দিলে ছ্যাঁকা লাগে।
এই জ্বরটা ভালো না। ম্যালেরিয়া না তো? কাইলও যদি জ্বর না ছাড়ে, ওরে যশোর শহরে নিয়া যা। ভালো চিকিৎসক দেখা। খরচাপাতি যা লাগে, আমি দিমু। আপনে মেহেরবান।
কাশেম, আমার এই শরাবের বোতলে একবার চুমুক দিয়া দেখবি নাকি কেমন লাগে?
কী যে কন সাহেব, তোবা তোবা! আমার ধর্মে ওই বস্তু এক্কেবারে হারাম। ও-কথা শোনালেও পাপ হয়। একদিন যদি জোর কইরা তোর মুখে ঢাইল্যা দেই?
নিশ্বাস বন্ধ কইরা থাকমু সাহেব। মইরা গ্যালেও গলায় নিমু না। ফইটকা মাঝে মাঝে দুই-এক চুমুক দেয়। আমি জানি। ও হারামজাদা.....
চোপ! আবার তুই ফটিকের নামে নালিশ করস? ফটিকও তো কয়, তুই নাকি আমার সোনামুগ ডাইল চুরি কইরা বাড়িতে পাঠাস? সইত্য কথা?
ডাহা মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা। অমন পাপ করলে আমি দোজখে যামু। আপনে সোনামুগ ছাড়া অন্য কোনো ডাইল খান না, আমি কি তা জানি না? ফইটকাটা শয়তান। ও মাছের মুড়া সব নিজে খায়, আর কাউরে দেয় না। আর তুই নাকি ফটিকের বউয়ের দিকে চক্ষু তরল করস?
ছি ছি ছি ছি! সে আমার মাইয়ার মতন। ওই লক্ষী আর আমার মাইয়া ফতিমা এক্কেবারে সমান সমান। ফইটকা এই কথা কয়? আমি তারে গলা টিপ্যা মারুম।
হ্যামিল্টন হা হা করে হাসতে হাসতে হাতের ইঙ্গিতে কাশেমকে চলে যেতে বললেন। খানিকক্ষণ হাসির পর তৃপ্ত হয়ে হ্যামিল্টন গেলাসের পানীয়তে চুমুক দিতে লাগলেন।
ফটিক আর কাশেমের এই ঝগড়া তিনি বেশ উপভোগ করেন। ইচ্ছে করেই তিনি হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় থেকে এই দু-জন কর্মচারীকে রেখেছেন। পরস্পরের বিরুদ্ধে এদের নানান অভিযোগ লেগেই আছে। তিনি নিজেও মাঝে মাঝে ওদের উসকে দেন। আবার এটাও তিনি লক্ষ করেছেন, যতই ঝগড়া করুক, ওদের দু-জনের মধ্যে একটা অবিচ্ছেদ্য টানও আছে।
দু-গেলাস বেশ দ্রুত শেষ করার পর তিনি পাশ ফিরে তাকালেন পাশের কেদারার দিকে। এখন সেখানে বসে আছে এক রমণী। তুঁতে রঙের গাউন ও গলায় একটা শাদা স্কার্ফ জড়ানো। সাহেবের পত্নী জেনি। তাঁর দিকে তাকিয়ে হ্যামিল্টন বললেন, ডারলিং, লুক অ্যাট দ্য স্কাই। ক্লাউডস গ্যাদারিং, স্টিল ইউ ক্যান সি ফ্লিকারিং অব মুনলাইট...বাই দ্য ওয়ে, তুমি নিজের হাতে যে তিনটে লেবুগাছ লাগিয়েছিলে, তাতে এবার ফল এসেছে, আজই আমি তোমার গাছের একটা লেবু খেলাম।
ঘন্টাখানেক বাদে ফটিক খাবার দেবে কি না জিজ্ঞেস করার জন্য ওপরে এসে দেখল হ্যামিল্টন সাহেব গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। দু-একবার মৃদু গলায় ডেকেও সে সাড়া পেল না।
মাঝে মাঝেই এরকম হয়, বেশি নেশা করার পর সাহেব কেদারাতেই হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকেন, তাকে বিছানায় নিয়ে যাওয়া যায় না। এভাবেই কেটে যায় সারারাত।
এখন তাকে জাগিয়ে তুলে খাওয়াবারও উপায় নেই। হাজার ডাকাডাকিতেও সাড়া দেবেন না। আর গায়ে ঠ্যালা দিয়ে জাগালে তিনি বীভৎস রকমের গালাগালি দিতে শুরু করবেন। চড়, লাথিও মারতে পারেন।ফিরে যাবার আগে ফটিক সাহাবের অর্ধসমাপ্ত মদের গেলাসটা তুলে এক চুমুকে মেরে দিল সবটা।
২
এই পরগনাটি আগে ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। এখন কোম্পানির রাজত্ব আর নেই, বর্তমানে এই পুরো দেশটারই অধিশ্বরী হয়েছেন মহারানি ভিক্টোরিয়া। তাই বিলেতে অবস্থিত কোম্পানির বোর্ড অব ডিরেক্টরসরা দ্রুত সম্পত্তি বেচে দিচ্ছেন দেশীয় জমিদারদের কাছে। আলাদা আলাদাভাবে প্রত্যেক প্রজার কাছ থেকে খাজনা আদায় করার বদলে জমিদারদের কাছ থেকে থোক টাকা সংগ্রহ করাই সরকারের পক্ষে সুবিধাজনক। এই পরগনাও কিনে নিয়েছেন কলকাতাবাসী এক জমিদার। আগে এখানকার ম্যানেজার ছিলেন চার্লস হ্যামিল্টন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর চাকরি গেছে, দেশীয় জমিদার দেশীয় নায়েব নিযুক্ত করেছেন। এলাকার সমস্ত জমি নব্য জমিদারদের দখলে এলেও ম্যানেজারের বাংলোটি পাওয়া যায়নি। হ্যামিল্টন কিছুতেই এ বাড়ি ছাড়বেন না বলে জেদ করে রয়েছেন। কোম্পানি পড়েছে মহা মুশকিলে। চুক্তি অনুযায়ী সব কিছুই জমিদারের হাতে তুলে দেওয়ার কথা। হ্যামিল্টনকে বাড়ি ছেড়ে দেবার জন্য অনুরোধ-উপরোধ, হুমকি, ভীতি প্রদর্শনের পরও সরানো যাচ্ছে না কিছুতেই। জমিদারও এ বাড়ির অধিকার না পেলে কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলে শাসানি দিচ্ছেন। হ্যামিল্টনের জেদ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক তো বটেই। কোম্পানিই যদি সরে যায়, তা হলে তার ম্যানেজারের তো কোনও অধিকারই থাকে না। তবু হ্যামিল্টন বলছেন, এ বাড়ি তিনি ছাড়বেন না কিছুতেই। কোম্পানি তাকে কলকাতায় একটি বাসস্থান তৈরি করে দেবার জন্য প্রস্তুত, হ্যামিল্টন তাতেও রাজি নন। তিনি কলকাতাতেও যাবেন না, বিলেতেও ফিরে যাবেন না।
ইংল্যাণ্ডের ইয়র্কশায়ার থেকে চার্লস হ্যামিল্টন ভারতে আসেন সতেরো বছর বয়েসে। প্রথম কয়েকবছর তিনি ছিলেন কোম্পানির রাইটার অর্থাৎ কেরানি। তারপর তিনি সিভিল সার্ভিসের ট্রেনিং নিয়ে জেলায় জেলায় ঘুরেছেন। শেষ পঁয়তিরিশ বছর তিনি আছেন এই ইব্রাহিমপুর পরগনায়। আগে ছিলেন সহকারী ম্যানেজার, পরে পুরোপুরি ম্যানেজার। আগে ম্যানেজারের কুঠি ছিল অন্য একটি ছোট বাড়িতে। নদীর ধারে এই সুদৃশ্য দোতলা বাংলো তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বানিয়েছেন। এখানকার সব আসবাবপত্র সাজিয়েছেন তাঁর স্ত্রী। সংলগ্ন বাগানটিতেও আছে তাঁর স্ত্রী’র হাতের স্পর্শ। জেনি খুব গাছপালা ভালোবাসতেন, গ্রামে ঘুরে ঘুরে নতুন নতুন গাছের চারা সংগ্রহ করে লাগিয়েছেন এখানে। এবং জেনির শেষ ইচ্ছে মতন তাঁর সমাধিও আছে এই বাগানের একপ্রান্তে। হ্যামিল্টন সাহেব আর দেশে ফিরে যেতে চান না, কারণ যেখানে তিনি জন্মেছিলেন, সেটাকে আর তিনি নিজের দেশ মনে করেন না।
ভারতে এসে কাজে যোগদান করার পর মাত্র দু-বার তিনি ফিরে গিয়েছিলেন ইংল্যাণ্ডে, ছুটি কাটাতে। দ্বিতীয়বার তাঁর মন টেকে নি, ফেরার জন্য ছটফট করেছিলেন। সেবারে ফেরার জাহাজেই জেনির সঙ্গে আলাপ-পরিচয়। অদ্ভুত রকমের প্রকৃতিপাগল সেই মেয়েটি বিয়ের পর আর ফিরতে চাননি ইংল্যাণ্ডে। এই বাংলাকেই তিনি নিজের দেশ করে নিয়েছিলেন। হ্যামিল্টন ইংল্যাণ্ডে তাঁর বাল্য-কৈশোরে যত বছর কাটিয়েছেন, তার দ্বিগুণের বেশি সময় কেটেছে এই বাংলায়। সেখানে তাঁর পিতা-মাতা বেঁচে নেই, নিকট আত্মীস্বজনও তেমন কেউ নেই। তিনি এখন ফিরে গেলে কেউ তাঁকে পাত্তা দেবে না। এ দেশ থেকে বহু টাকা সংগ্রহ করে কিছু কিছু ইংরেজ ফিরে যায় ইংল্যাণ্ডে। সেখানে জাঁকজমক, বিলাসিতায় ডুবে থাকলেও সমাজে বিশেষ পাত্তা পায় না, বেশিরভাগ মানুষই তাদের কেমন যেন অবজ্ঞার চোখে দেখে। লর্ড ক্লাইভকে আত্মহত্যা করতে হয়েছিল। হ্যামিল্টনকে এখানকার কত মানুষ চেনে, তিনি এখানকার ভাষা জানেন, আচার-আচরণও নিখুঁতভাবে শিখেছেন। তিনি সকলের সঙ্গে মিশতে পারেন সমানভাবে। সবচেয়ে বড়ো কথা, এখানেই তো রয়ে গেল জেনি।
এখন অন্য কোনো কাজ নেই, মদ্যপানেই বেশি সময় কাটে। জেনির মৃত্যুর পর মদ্যপানের মাত্রা বেড়ে গেছে। মদ্যপান বিশেষ করে তাঁর ভালো লাগে এই কারণে যে নেশা বেশ জমে উঠলে তিনি আর জেনির সঙ্গে বিচ্ছেদ বোধ করেন না। জেনির সঙ্গে অনেক কথাবার্তা হয়, তাঁর নিঃসঙ্গতা কেটে যায়। এক-একদিন বেলা হতে না হতেই তিনি বোতল খুলে বসেন, সেদিন আর বেরুনোই হয় না বাড়ি থেকে। আবার এক-একদিন তাঁর মেজাজ বেশ ফুরফুরে থাকে সকালবেলা, তখন তিনি পাড়া বেড়াতে বেরিয়ে পড়েন। পায়ে বুটজুতো, ঢোলা প্যান্ট, ডোরাকাটা কুর্তার ওপরে একটা রং-জ্বলা কালো রঙের কোট পরা, দীর্ঘকায় সাহেবটির মাথার অধিকাংশ চুলই শাদা। কাঁধে ঝোলানো থাকে বন্দুক, হাঁটেন থপথপ করে। এখানকার অনেক মানুষকেই তিনি ডাকেন নাম ধরে। তাদের কুশল সংবাদ নেন। ঝড়ে কার বাড়ির চাল উড়ে গেছে, কার মেয়েকে কুমিরে টেনে নিয়ে গেছে, সেসব খবরও তিনি মনে রাখেন। ছোট ছোট কচিকাঁচারা অন্য সাহেব দেখলে ভয় পায়, দৌড়ে পালায়। এই সাহেবকে দেখলে তারা তাঁকে ঘিরে ধরে চিলুবিলু করে। সাহেব তাদের কারুর গাল টিপে দেন, কারুর মাথার চুলে হাত বুলোন, আবার চিমটিও কাটেন দু-একজনকে।
বড়োরাও তাঁর সামনে এসে হাতজোড় করে দাঁড়ায়। কেউ তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে এলে তিনি বাধা দিয়ে বলেন, আরে র র, ছুঁইস না, ছুঁইস না। আমি তো মেলেচ্ছ, আমার পা ছুঁইলে তগো জাত যাইব।
সাহেব যে কিছুতেই বাংলো বাড়ির দখল ছাড়বে না, তা এ তল্লাটের সব মানুষই জানে। কিন্তু যতই বন্দুক থাক, একা সাহেবের পক্ষে কি জমিদারের পাইক-বরকন্দাজদের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব? সাহেব জানেন, তাঁর আসল জোর, এইসব গ্রামের মানুষের ভালোবাসা। এখানকার মানুষ তাকে ছাড়তে চায় না। কোনো সন্দেহজনক নতুন মানুষকে দেখলে তারা দৌড়ে গিয়ে সাহেবকে আগে খবর দেয়। সঠিক নামটা উচ্চারণ করতে পারে না বলে অনেকেই আড়ালে হ্যামিল্টন সাহেবকে বলে লন্ঠন সাহেব। তাঁর বাংলোর বারান্দায় সারারাত একটা ঝুলন্ত লন্ঠন ঝোলে, সেটাও একটা কারণ। আবার কেউ কেউ যে বলে পাগল সাহেব, তাও হ্যামিল্টনের কানে এসেছে। তিনি তা শুনে হাসেন। পাগল সাজতে তাঁর আপত্তি নেই। সাহেব যখন এখানে প্রথম আসেন, তখন এখানে বাজার-হাট কিছু ছিল না। স্থানীয় মানুষকে অনেক কষ্ট করে মনসাগঞ্জের হাটে যেতে হত। তাও বর্ষাকালে নৌকো ছাড়া সেখানে যাওয়ার আর কোনো উপায় ছিল না। মানুষের অসুবিধের কথা বিবিচনা করেই হ্যামিল্টন নদীর ধারে অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দুটি দোকান স্থাপন করেছিলেন। সে প্রায় সতেরো বছর আগেকার কথা। এখন সেখানে রীতিমতন একটি বাজার গজিয়ে উঠেছে। তেরো-চোদ্দটি দোকান। এ বাজারের সঙ্গে কোম্পানির কোনো সম্পর্ক ছিল না। সম্পূর্ণটাই হ্যামিল্টনের নিজস্ব উদ্যোগ। লোকের মুখে মুখে নাম রটে গিয়েছিল ‘চার্লস বাজার।’ এখন সেটাই বিকৃত হয়ে ‘চালিয়া বাজার।’ এই নদী দিয়ে স্টিমার চালু হবার পর বাজারটি দিন দিন আরো জমে উঠছে।
হ্যামিল্টনের এই নিজস্ব বাজার থেকে কিছু আয় হয়। দোকানদাররা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই নিয়মিত কর দেয়। কিন্তু সাহেবের অর্থের তেমন প্রয়োজন নেই, লালসাও নেই। এখান থেকে যা অর্থ পান, তা গরিব মানুষদের জন্য খরচ করেন। সাহেব খেয়ালি মানুষ, কেউ কন্যাদায় কিংবা পিতৃশ্রাদ্ধের জন্য সাহায্য চাইলে তিনি মুখভেটকি দিয়ে বিদায় করে দেন, আবার কারুর গুরুতর অসুখের খবর পেলে কিংবা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার প্রয়োজনে কিংবা কেউ তীর্থযাত্রায় যেতে চাইলে তিনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মুঠো মুঠো পয়সা দেন। দূরদেশ থেকে একজন এসে এখানে নতুন কচুরি-জিলিপির দোকান খুলেছে। সে দোকানের পাশ দিয়ে যেতে গেলে ভুরভুর করে খাঁটি ঘিয়ের গন্ধ পাওয়া যায়। দোকানের একপাশে পাতা একটা বেঞ্চির ওপর বসে পড়ে সাহেব হাঁক দিলেন, কই রে, দে, জিলিপি-হালুয়া কী আছে দে! গলায় পইতে জড়ানো মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি হাতজোড় করে বললো, পেন্নাম হই সাহেব। হালুয়া ফুরিইয়া গেসে জিলিপি দিমু?
সাহেব বললেন, তাই দে।

লোকটি জানে, সাহেব কচুরি পছন্দ করেন না। মিষ্টদ্রব্য ভালোবাসেন। একটি কলাপাতায় সে চারখানা জিলিপি সাজিয়ে এনে দিলো।
সাহেব ভুরু তুলে বললেন, মোটে এই কয়খান? এ তো নস্যি! তোর ঝুড়িতে কতগুলান আসে? নিয়ায় সব নিয়ায়। দ্যাখোস না, আমার প্যাটখান কত বড়ো। আমার রাইক্ষসের মতন খুদা। লোকটি এক ঝুড়িভর্ত্তি জিলিপি নিয়ে এল। সাহেব তা দেখে সন্তুষ্ট হয়ে হেঃ হেঃ করে হাসলেন। তারপর রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড়ানো দুটি শিশুর দিকে চেয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন, আয়,আয়। দুটি শিশুই আঙুল চুষছিল, দৌড়ে এল সঙ্গে সঙ্গে।
সাহেব বললেন, তগো আঙুলে কি মধু থাহে? খা, জিলিপি খা, যে কয়টা পারস।
বাচ্চাদুটো ঝাঁপিয়ে পড়লো ঝুড়ির ওপর।
কী করে খবর রটে যায় কে জানে। প্রায় চোখের নিমেষেই যে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল আরো দশ-বারোটি ছেলেমেয়ে। কে কত বেশি খেতে পারে শুরু হয়ে গেল তার প্রতিযোগিতা। তাদের মুখ আর হাত রসে মাখামাখি। সাহেব প্রসন্নমুখে দেখতে লাগলেন সেই জিলিপি উৎসব। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, একটি বাচ্চা মেয়ের একচোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছ। একে তো ঠিক আনন্দের অশ্রু বলা যায় না। যদি তাই হয়, তাই বা শুধু এক চোখে হবে কেন?
তিনি মেয়েটির থুতনি ধরে জিজ্ঞেস করলেন, অ্যাই, কান্দোস ক্যান?
মেয়টি বললো, কান্দি না তো!
সাহেব বুঝলেন, এটা এক ধরনের চোখের অসুখ। আগেও কয়েকজনকে দেখেছেন। বিনা চিকিৎসায় এই রোগে কেউ কেউ অন্ধ হয়ে যায়। মাঝেমাঝেই অন্ধ মানুষও চোখে পড়ে এ অঞ্চলে। সাহেব মনে মনে সংকল্প করলেন, শহর থেকে একজন চক্ষুরোগের চিকিৎসক আনতেই হবে। অন্তত কয়েকদিনের জন্য।
৩
যেদিন নেশা তেমন জমে না, সেদিন হ্যামিল্টনের সমস্ত শরীর অস্থির অস্থির লাগে। সেসব রাতে পাশের কেদারায় জেনিকেও দেখা যায় না। মনে মনে সাধ্যসাধনা করতে থাকেন, জেনি কাম, প্লিজ কাম। মাই ডারলিং, হোয়্যার আর ইউ?
তারপর একসময় উঠে গিয়ে বারান্দায় রেলিং ধরে জেনির কবরের দিকে তাকিয়ে গলা ফাটিয়ে ডাকেন, জেনি, জেনি!
সেই আকুল আহ্বান হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে চলে যায় নদীর ওপর দিয়ে। ঝিকমিক করে আকাশের তারা। কোন নৌকা থেকে শোনা যায় ভাটিয়ালি গান। চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে সাহেবের গলা ভেঙে যায়, দূর থেকে শুনলে মনে হয় কোনো ক্লান্ত রাতপাখির ডাক। প্রায় সারারাত জেগে থাকার ফলে ভোর থেকে সাহেব ঘুমোন অনেক বেলা পর্যন্ত। খিদমদগাররা তাঁকে ডাকবার সাহস পায় না। একদিন ডাকতেই হলো।
একজন কেউকেটা ধরনের ব্যক্তি সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। সঙ্গে তাঁর তিনজন পাহারাদার। তাদের তিনজনেরই হাতে বল্লম। এখন বেলা প্রায় দ্বিতীয় প্রহরে পড়েছে, এ সময়ে ঘুমোচ্ছেন শুনে তিনি বিশ্বাস করছেন না। ডাকাডাকিতে শেষ পর্যন্ত উঠে বসে সাহেব হুংকার দিলেন, ক্যান ডাকলি রে শুয়ার! কাশেম হাতজোড় করে কাঁচুমাচু গলায় পুরো বৃত্তান্তটি জানালো। সাহেব একটা কুর্তা গায়ে জড়িয়ে নিলেন কোনো রকমে। মুখ ধুলেন না। চক্ষু রক্তবর্ণ। বন্দুকটা হাতে নিয়ে তিনি দুপদাপ করে নেমে এলেন সিঁড়ি দিয়ে। সদর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন এক আগন্তুক। পোশাকের জাঁকজমক দেখে তাঁকে একজন বিশিষ্ট মানুষ বলেই মনে হয়। একটা জরির কাজ করা কুর্তা গায়ে, মাথায় পাগড়ি। মুখে অভিজাতসুলভ চাপা অহংকারের ভাব। সেসব অগ্রাহ্য করে হ্যামিল্টন বললেন, হু আর ইউ? কী চাই?
আগন্তুক বললেন, মে আই টক টু ইউ ফর এ হোয়াইল?
হ্যামিল্টন বললেন, হু সেন্ট ইউ? আমার সাথে কারও তো কোনও কথার প্রয়োজন নেই!
আগন্তুক আবার বললেন, আই উইল টেক ওনলি ফিউ মিনিটস অব ইয়োর টাইম।
সাহেব প্রায় ধমকের সুরে বললেন, আপনি বাংগালি? বাংগালি হয়ে বাংগালায় কথা বলতে পারেন না?
কে আপনি? কে আপনাকে পাঠিয়েছে? জমিদারের নায়েব নাকি?
.jpg)
ব্যক্তিটি এবার স্মিতহাস্যে বললেন, না আমাকে নায়েব পাঠায়নিকো। আমি নিজেই এসেছি। এই অধমের নাম শ্রীযুক্ত দ্বারকানাথ ঠাকুর। পেছনের পাহারাদারদের একজন বললেন, ইনিই স্বয়ং জমিদার।
সাহেব বললেন, ঠাকুর? নতুন জমিদার? আপনি নিজে এসেছেন কি এই কুঠিবাড়ির দখল নিতে? আগেই বলে রাখি, আমি জীবন থাকতে এ বাড়ির দখল দেব না। আপনি যা খুশি করতে পারেন!
দ্বারকানাথ তাঁর অভিজ্ঞ চোখে এই নেশাখোর সাহেবের ভাঙা-চোরা মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে বুঝে গেলেন, এ ব্যক্তির আর আয়ু বেশিদিন নেই। তিনি বিগলিত মুখে বিনয়ের অবতার হয়ে বললেন, আমি দখল নিতে আসিনি। তেমন উদ্দেশ্য থাকলে আমার নিজের আসবার কোনো প্রয়োজন ছিলই না।
তবে?
আপনি আমাদের অতিথি। আপনার রক্ষণাবেক্ষণ আমাদেরই আমাদেরই কর্তব্য। আমি জ্ঞাত আছি যে এ বাড়িতে আপনার সহধর্মিণীর পবিত্র স্মৃতি আছে। আমরা কোনোক্রমেই তা নষ্ট করতে চাই না। মিস্টার হ্যামিল্টন, আপনি এ বাড়িতে যতদিন খুশি থাকবেন, আজীবন থাকুন, তাতেই আমরা ধন্য হব। এ বাড়ির সংস্কার, মেরামতির ব্যয়ও আমার এস্টেট বহন করবে, যখন যা প্রয়োজন জানাবেন আমাদের।
হ্যামিল্টন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইলেন দ্বারকানাথের দিকে। তিনি শুনেছিলেন, নব্য জমিদারশ্রেণী খুব অর্থলোভী হয়। প্রজাদের টাকায় শহরে বসে আমোদ-বিলাসিতায় বহু অর্থ ব্যয় করে। এ যে শুনছেন উলটো কথা! তিনি বললেন, আমি দুঃখিত, ঠাকুরবাবু। আপনাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। আমি এখন আপনার প্রজা, আপনাকে অবশ্যই মান্য করা উচিত। ভেতরে আসুন, আসন গ্রহণ করুন।দ্বারকানাথ পা থেকে নাগরাজুতো খুলে ফেলতে লাগলেন।
মন্তব্য
By