অন্য দিওয়ালি

ঋজু বসু
আলোর উৎসবে জ্বলজ্বল করে ফরিদপুরের বাড়ি। মায়ের হাতের বুঁদিয়া-ভুজিয়া, বন্ধু হাসিনা-কাকলিদের সঙ্গে হুটোপাটির স্মৃতিতে বুঁদ হন কলকাতার বড়বাড়ির বধূ। লিখছেন ঋজু বসু
sangri

সাংরির তরকারিতে হিং দেওয়া হয় কি হয় না, তা-ই নিয়ে শাশুড়ি আর বউমায় ঈষৎ মতান্তর।

বউমা সনিয়া বললেন, যদ্দূর মনে পড়ছে আমাদের ফরিদপুরের বাড়িতে মা বোধহয় সুখা লাল মির্চা, সর্ষের তেলের সঙ্গে হিংয়ের ছৌঁকটুকুও (ফোড়ন) দিতেন। মরুদেশের ঘ্রাণমাখা মহার্ঘ শাকটি এই সোনার বাংলায় রাতভর ভিজিয়ে রাখা হত। পরের দিন সকালে সেদ্ধ করে রান্না শুরু। নুন-হলুদ, আমচুর, দই মেশানো রাজস্থানি মশলা কাঁচরিগুঁড়ো— আরও কত কী মিশত এই সাংরিতে!

তবে শাশুড়ি মা সারদাদেবী এই হিং নিয়ে বাড়াবাড়িটা মানলেন না। সাংরিতে হিং কই দেওয়া হয়? শেষটা বউমা বললেন, তা হলে মনে হচ্ছে আমিই গুলোচ্ছি।

উত্তর কলকাতার কাশী বোস লেনের সাবেক পুজোয় নবমীর ছপ্পান্ন ভোগ! কের সাংরির এই তরকারি তার একটি বিশিষ্ট চরিত্র। ফরিদপুরে দিওয়ালির পরের দিন চকবাজারে রামকৃষ্ণ অগ্রবালের বাড়ির দাওয়াতেও এই সাংরি পাত পেড়ে খেতেন ওই তল্লাটের জাতধর্ম নির্বিশেষে ছেলেবুড়োর দল। ঠিক যেমনটি কাশী বোস লেনের পুজোয় বাংলাভাষীরা সক্কলে এই মাড়োয়ারি পদটি আঙুল চেটে খান। তাতে হিং পড়ুক আর না-পড়ুক,সর্ষের তেলের ছোঁয়াচ আলাদা মাত্রা জোড়ে। রাজস্থানে মাড়োয়ারি ঘরে সাংরিতে তিলের তেল দেওয়া রেওয়াজ। কিন্তু বউমা-শাশুড়ি দু’জনেই বললেন, বঙ্গাল মুলুকের সর্ষের তেলেই স্বাদ খোলে।

সাংরি নামক মরু শাকটি তখন দিওয়ালির আগে কলকাতার বড়বাজার থেকে বোঝাই করে ফরিদপুরে নিয়ে যেতেন সনিয়ার বাবা অগ্রবাল মশাই। কড়াই পুরী বা আটার লুচি কিংবা ডালের পুর ঠাসা পুরনপুরীর সঙ্গতে দুর্ধর্ষ জমে এই শাকের টকঝাল স্বাদ। কাশী বোস লেনের সাবেক বাসিন্দা, অধুনা সল্টলেক নিবাসী চৌধুরী পরিবারের বউমা সনিয়া আফশোস করছিলেন, আজকালকার বাচ্চারা কী যে চাউমিন, পিৎজার জন্য ছোঁক-ছোঁক করে! দুর্গাপুজো হোক বা দিওয়ালি, এই সাংরি ছাড়া আমরা ভাবতেই পারি না। 

Riju Basu On Diwali-Ananda Utsav

শুধু সাংরিই বা কেন, দিওয়ালি মানে তো ঠান্ডা-ঠান্ডা আরামের কাঞ্জি বড়া, দই বড়াও! কিংবা কেরিয়া ফলির ভাজাভুজি। রাজস্থানি ঝোপজাত বুনোফল হল কেরিয়া।সাংরির শাকের তরকারিতেও তার দেখা মেলে। তা ছাড়া, নানা কিসিমের বুন্দিয়া-লাড্ডু, গুলাবজামুনের ছড়াছড়ি।

কলকাতায় চৌধুরী পরিবার এ সব রান্না দুর্গাপুজোর সময়েই বাঙালি পড়শিদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খান। আর আড়াই দশক আগে ফরিদপুরে সনিয়ার কিশোরীবেলা জুড়ে এ সব স্বাদ-গন্ধ মিশে আছে সুহৃদ-প্রতিবেশী খালা-চাচি, মামা-কাকাদের প্রীতির উত্তাপে।

আড়াই দশক হল বাংলাদেশ ছেড়েছেন সনিয়া। কাশী বোস লেনের মাড়োয়ারি পরিবারের জাঁদরেল কুলপতি গোবিন্দরাম চৌধুরীর পরিবারের ছেলে কমলকিশোরের সঙ্গে ফরিদপুরী কন্যেটির বিয়ে হয় ১৯৯৪ সাল নাগাদ। কাশী বোস লেন, সল্টলেকের শ্বশুরবাড়ির ঘরকন্নার ফাঁকে-ফাঁকে ফরিদপুরে বাপের বাড়ি যাওয়া অবশ্য বন্ধ হয়নি। ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট হলে, এখনও ‘দ্যাশের ছেলে’গুলোর জন্য মনটা হাঁকপাক করে ভারতীয় বহুর। বাংলাদেশ হারলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন মজা করে আওয়াজ দিতে ছাড়েন না। তবু বাপের বাড়ি বা বাড়ি বললে এখনও সনিয়ার কাছে ফরিদপুরের সেই দুনিয়াটাই ভেসে ওঠে।

দেশের জন্য এই টান গাঢ় হয় দিওয়ালি এলেও। এখন দিওয়ালির হপ্তাখানেক আগেই লোকজন এসে সল্টলেকের বাড়ি আলোয় সাজিয়ে দিয়ে যায়। বাহারি চাইনিজ টুনি বাল্বের জৌলুসে ঘর-দালান ঝকমক করে। কিন্তু সনিয়ার মনের চোখে ভাসে, পদ্মার শাখা কুমার নদের কিনারে ফরিদপুরের দোতলা বাড়িটার ছবি। দুর্গাপুজোরও আগে থেকে এক মাস ধরে মা প্রদীপ জ্বালানোর সলতে পাকানো শুরু করতেন। ফরিদপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলের ক্লাস সেরে ছুট্টে বাড়ি ফেরার জন্য মুখিয়ে থাকত সনিয়া ও তার দিদি। মায়ের সঙ্গে সলতে তৈরিতে হাত লাগাতে হবে! কোনও কোনও দিন স্কুলের হাসিনা, কাকলি, শাহিদারাও যোগ দিত। আর দিওয়ালির সকাল থেকে বাড়ির কোণে কোণে ছাদে মাটি লেপে তাতে মাটির প্রদীপ বসিয়ে রাতের অপেক্ষা শুরু! 

Riju Basu On Diwali-Ananda Utsav

দিওয়ালির আলোর ওয়াট এখন কলকাতায় ঢের বেড়েছে। কিন্তু সেই মাটির প্রদীপের নরম স্নিগ্ধতাই ‘আপন আলো’ কথাটি মনে করাতো। ‘দীপালিকায় জ্বালাও আলো, আপন আলো, সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে’!

পুজোর পর থেকেই তখন ফি-সন্ধেয় বাড়িতে বাবার সঙ্গে আড্ডা দিতে আসতেন চাচা-কাকারা। সাজাহান কাকা, রমেশ কাকা, আতিয়ার কাকা, জামাল কাকা, ইউনিস ভাইরাও দিওয়ালির প্রদীপের সলতে তৈরিতে যোগ দিতেন। আর থাকতেন, কয়েক পুরুষ ধরে ফরিদপুরবাসী ব্যবসায়ী পরিবারটির সুখদুঃখের শরিক, স্থানীয় দুই যুবা সোনা আর রতন।

৭১-এর বাংলাদেশের জন্মের সময়ে সনিয়ার জন্ম হয়নি। তাঁর দিদি তখন সবে ক’মাসের। খানসেনাদের হানার আতঙ্কে ঘরদোর ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হচ্ছিল। দু’মাস ধরে ইতি-উতি এর-ওর বাড়ি আশ্রয় নিয়ে গোটা পরিবারটি পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হয়। তখন পরিবারের পরম সুহৃদ স্থানীয় দুই মুসলিম যুবা সোনা আর রতনই তাদের বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল, এ কথা আজীবন মায়ের কাছে শুনে এসেছেন সনিয়া। কলকাতার শ্বশুরবাড়িতে বসে দিওয়ালির অনুষঙ্গে ওই সব পুরনো মুখগুলোই নাছোড় ভঙ্গিতে বার বার পথ আটকে দাঁড়ায়।

কলকাতার দিওয়ালিতে অনেক আত্মীয়ের ছড়াছড়ি। এক সপ্তাহ আগে থেকে আত্মীয়-কুটুমদের সঙ্গে মিষ্টি-কাজু-কিসমিস বিনিময় শুরু হয়ে যায়। বাড়ির সব মেয়েদের শ্বশুরবাড়িতে গোন্দ কা চাক্কি, দিল কা সার, রকমারি পেঠা, সোয়ালি বা ঝাল-ঝাল নিমকি ‘মাঠি’, কচৌরি পাঠানো হয়। কিন্তু ফরিদপুরের সব ক’টা রান্নায় সনিয়ার মা জানকীদেবীর আঁচলের ঘামতেল মিশে থাকত। ওখানে সাহায্য করার অত লোক কোথায়! মা দশ হাতে সব একা করতেন। দাওয়াতে বেশি উৎসাহ যেন স্থানীয় মুসলিম সমাজের। মা পুজোর পরে একাদশী থেকেই আয়োজনে লেগে পড়তেন। থরে থরে বয়ামে সাজানো থাকত বুঁদিয়া, ভুজিয়া। রকমারি পাঁপড় আর আচার। পুরী-সাংরি থেকে লাড্ডু-চন্দ্রকলার সমারোহে জেগে উঠত ভালবাসার একটি দেশ।

আজকের দিওয়ালির আলোর ছটাতেও সেই স্মৃতির সঞ্চয় কিছুতে ম্লান হয় না।

সর্বশেষ সংবাদ

ভাইকে এ বছর ভাইফোঁটাতে কী দেবেন ভেবেছেন? চলুন দেখি কিছু উপহারের নমুনা।
থাকছে অসংখ্য সিসি ক্যামেরার নজরদারি।
আজ কালীপুজো। দীপাবলির আলোয় সেজেছে চারিদিক।
শুধু কালীঘাট কিংবা দক্ষিণেশ্বর নয়। এ শহরে ছড়িয়ে রয়েছে ছোট বড় অসংখ্য কালীমন্দির।
বাজি পোড়ানোর সময় কিছু সাবধানতা নিতে বললেন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা নন্দিনী রায় ও চেষ্ট ফিজিশিয়ান ডা সুস্মিতা রায়চৌধুরি।
মোমপ্রদীপ ও ফ্যান্সি প্রদীপের চাহিদা
শিল্পী মগ্ন হয়ে দেখতে থাকেন নিজের সৃষ্টি
লাড্ডুটা সত্যিকারের নয় তো বটেই। এ হচ্ছে আলোর খেলা।