ইতিহাসের পুজো বেঁচে আছে গল্প হয়েই

বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য
১৯ অগস্ট, ২০১৭, ২১:১৩:৪৪ | শেষ আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১৩:৫৩:২০
কিছু হারিয়েছে। অনেক কিছু আবার থেকেও গিয়েছে। বনেদি বাড়ির পুজো প্রস্তুতির সেই সাবেকিয়ানার সন্ধান দিচ্ছেন বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য
চলছে কাঠামো পুজো।—নিজস্ব চিত্র।

শরতের আঙিনায় মাঝে মধ্যেই ধেয়ে আসছে ক্ষ্যাপা শ্রাবণ। ইতস্তত কালো মেঘের ঘনঘটা ঈঙ্গিত দেয় এখনও বিদায় নেয়নি খেয়ালি বর্ষা। মুহূর্তেই বিন্দু বিন্দু জলে ঝাপসা হয়ে আসে চার কপাটের সাবেক জানলার কাচ। আর সেই ঝাপসা কাচে ফুটে ওঠে স্মৃতিমেদুর কত পুজোর গল্প-ছবি। ভাদ্রের শুরুতেই আকাশের নীল দেওয়ালের গায়ে পেঁজা তুলোর শুভ্র সারি এখনও মরীচিকা। তবু হাতে মাত্র আর একটা মাস!

অভিজাত কর্পোরেট পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে মাস ছ’য়েক আগে থেকেই। সেখানে পুরোদমে চলেছে থিমের কাজ। তবে আটপৌরে মধ্যবিত্ত পাড়ায় সদ্য পড়েছে মণ্ডপ তৈরির বাঁশ। কোথাও বা টাঙানো হয়েছে পুজোর ফেস্টুন। কুমোরটুলি, পটুয়াপাড়া কিংবা নামকরা থিমশিল্পীর স্টুডিওতে চলেছে প্রতিমার নির্মাণের। তবে এরই মা‌ঝে চলছে অন্য এক প্রস্তুতি। থামওয়ালা ঠাকুরদালানের কোণে তিল তিল করে গড়ে উঠছেন কোথাও দশভূজা কোথাও আবার শিবদুর্গা। কলকাতার কুমোরটুলিতে কিংবা কৃষ্ণনগরের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিমা তৈরি শুরু হয়ে যায় সেই চৈত্র-বৈশাখ থেকেই, তবে বনেদি বাড়ির পুজোয় রয়েছে বাঁধাধরা কিছু নিয়ম। রথযাত্রা কিংবা জন্মাষ্টমীতে কাঠামো পুজোর পরেই আনুষ্ঠানিক ভাবে তৈরি হয় প্রতিমা নির্মাণের পর্ব। এর পরে ধাপে ধাপে বাঁশ চিরে বাখারি তৈরি থেকে খড়-বিচুলি বেঁধে দেবীর অবয়ব গঠন, এক মেটে, দো মেটের পর্ব শেষে শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় মৃণ্ময়ী চিন্ময়ী রূপ ধারণ যেন এক ঐতিহ্যের রূপকথা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। তাই কিছু পরিবারে পুজো হলেও বাড়িতে আর প্রতিমা তৈরি হয় না। পরিবর্তে তা কিনে আনা হয় শিল্পীর কারখানা থেকে। তবে কিছু সাবেক পরিবারে বাড়িতেই চলছে প্রতিমা নির্মাণ পর্ব। বাড়িতে এঁটেল মাটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এঁটেল মাটির সেই গন্ধ বাড়ির আনাচ-কানাচ ঘুরপাক খেয়ে জানান দেয় পুজো আসছে। তার সঙ্গে তুষ-মাটির প্রলেপ যখন প্রতিমার গায়ে পড়ে তখন সেই কটু গন্ধও জানান দেয়, পুজোর আর বেশি দেরি নেই‌। এ সময় বাড়ির কচিকাঁচাদের দেদার আনন্দ। ধাপে ধাপে ‘ঠাকুর’ তৈরির মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে এক অনাবিল আনন্দ। চোখভরা বিস্ময়ে পড়ার টেবল ছেড়ে তখন বেশি সময় কাটে ঠাকুরদালানেই।

Durga Puja preperations starts

সাবেক পরিবারে বাড়িতে চলছে প্রতিমা নির্মাণ পর্ব। 

অন্য দিকে, এখনও জন্মাষ্টমীর পর থেকেই শুরু হয়ে যায় ঠাকুরদালানের মেরামতি, চুনকাম। বহু দিনের পরিচিত মিস্ত্রি দলবল নিয়ে কোমর বেঁধে লেগে পড়ে কাজে। মহালয়ার আগে থেকেই পুজোকে কেন্দ্র করে গৃহকর্তার তৎপরতা বেড়ে যায়। ঠাকুরমশায়ের দেওয়া ফর্দ থেকে যেন কিছু বাদ না পড়ে। বাড়ির গিন্নির উপর থাকে তার দায়িত্ব। বাড়ির পুরনো ভৃত্যকে দিয়ে অতি সন্তর্পণে পরিষ্কার করানো হয় সেকেলে ঝাড়বাতি আর ফানুস। আগে পুজোর ক’দিন জ্বলত রেড়ির তেলের কূপি আর মোমবাতি। এখন তার জায়গা নিয়েছে ইলেকট্রিক বাতি।

গ্রামাঞ্চলের কুমোরবাড়িতেও বর্ষা পেরোতেই ব্যস্ততা তুঙ্গে। দেবীঘট, কুণ্ডুহাঁড়ি, সহস্রধারা, ধুনুচি, সরা, অষ্টকলস কিংবা মাটির প্রদীপ তৈরিতে সময় কেটে যায়। খামখেয়ালি বর্ষার চোখরাঙানি এড়িয়ে মাটির জিনিসগুলি রোদে শুকিয়ে, ভাটায় পুড়িয়ে, রং করে বাড়ি বাড়ি কিংবা শহরে জোগান দেওয়ার পালা আজও অটুট।

সে কালের পুজোর সময় গ্রামেগঞ্জের অভিজাত বাড়ির গিন্নিদের পায়ে আলতা বুলিয়ে দিত নাপিতানি। গিন্নিরাও রূপচর্চায় অবলম্বন করতেন ঘরোয়া পদ্ধতি। শহর থেকে গৃহকর্তা পরিবারের মহিলাদের জন্য আনতেন ধনেখালি, বেগমপুরি কিংবা জামদানি শাড়ি। আর ছেলেদের জন্য আসত ফরাসডাঙার কালোপেড়ে ধুতি কিংবা শান্তিপুরি জোড়। পুজো উপলক্ষে বাড়ির কর্মচারী, ভৃত্য, দারোয়ান, গাড়োয়ান সকলের হাতে নতুন কাপড় তুলে দিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসতেন গৃহকর্তা। আগে বেশিরভাগ বনেদি বাড়িতে রেডিমেড জুতো পরার চল ছিল না। শহরের নাম করা জুতোর দোকান থেকে পায়ের মাপ নিতে আসতেন দক্ষ কারিগর। বাড়ির ছোট-বড় সকলের পায়ের মাপ নিয়ে জুতো তৈরি করে সে দিয়ে যেত। এ সব কবেই ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে। বেঁচে আছে শুধু গল্প হয়ে।

সর্বশেষ সংবাদ

দীপাবলি মানে অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরা। ফুল, প্রদীপ, রঙ্গোলির রঙে মনকে রাঙিয়ে তোলা।
হেডফোন বা হেডসেট এমন বাছুন যা কি না আপনার কান আর শরীরকে কষ্ট না দেয়।
ছবি তোলার প্রথম ক্যামেরা কোডাক যে দিন বাজারে এল বিক্রির জন্য, সেই ১৮৮৮ সালে। পাল্টে গেল ছবি তোলার সংজ্ঞাই।
আগে এই প্রথা মূলত অবাঙালিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন লক্ষ্মীলাভের আশায় বাঙালিরাও সমান ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
ধন কথার অর্থ সম্পদ, তেরাসের অর্থ ত্রয়োদশী তিথি।
এই একবিংশ শতাব্দীতে ১৫৯০-এর একটুকরো আওধকে কলকাতায় হাজির করেছেন ভোজনবিলাসী শিলাদিত্য চৌধুরী।
আমেরিকার সেন্ট লুইসের প্রায় ৪০০ বাঙালিকে নিয়ে আমরা গত সপ্তাহান্তে মেতে উঠেছিলাম দূর্গা পুজো নিয়ে।
শারদীয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই আগমনীর বার্তা নিয়ে হাজির দীপান্বিতা।