অতীত আর বর্তমানের যোগসূত্র ঠাকুরদালান

বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য
০২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১৬:১২:১৬ | শেষ আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১৩:৫৩:২০
ঠাকুরদালান মানেই অতীতের পুজো আর আজকের পুজোর মাঝে এক নিবিড় যোগসূত্র! লিখছেন বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য।
বদনচন্দ্র রায়ের বাড়ির পুজো। ছবি: সংগৃহীত।

গথিক কিংবা করিনথিয়ান থামের উপরে অপরূপ কারুকার্যে ভরা খিলানযুক্ত ঠাকুরদালান যেন বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্য দুর্গোৎসবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে। দেশীয়, পাশ্চ্যাত্য ও ইসলামিক স্থাপত্য শৈলীর প্রভাবে বাংলার বিভিন্ন ঠাকুরদালানে গড়ে উঠেছিল ব্যতিক্রমী এক স্থাপত্যধারার। শুধুমাত্র পুজোর জায়গা হিসেব নয়। ঠাকুরদালানের প্রভাব, বিস্তৃতি জড়িয়ে আছে বাঙালির শিল্পে, সাহিত্যে, এমনকী জীবনের বারো মাসের তেরো পার্বণের সঙ্গে। ঠাকুরদালান শব্দটার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে স্মৃতিমেদুরতা। এক কালে যে ঠাকুরদালানে শোভা পেত বেলজিয়াম কাচের অভিজাত ঝাড়বাতি সেখানেই স্থান পেয়েছে হাল আমলের চড়া বৈদ্যুতিন আলো।

কালের ঝড়ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে কলকাতা-সহ বাংলার বিভিন্ন জায়গায় অতীতের স্থাপত্য বৈচিত্রের নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাত খিলান পাঁচ খিলান কিংবা তিন খিলানের সাবেক দালান। এই সব দালানে চোখে পড়ে কোথাও পঙ্খের কাজে পত্রাকৃতি বিন্যাস, কোথাও আবার সূক্ষ্ম জাফরির কাজ।

Durgapuja Of Famous Families Of West Bengal-Ananda Utsav 2017

আঁটপুরের মিত্র পরিবারের চণ্ডীমণ্ডপ।

সাবেক বাংলায় দুর্গোৎসব হত চণ্ডীমণ্ডপেকালক্রমে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের প্রভাবে বিভিন্ন রাজপরিবারে, জমিদারবাড়ি বা বর্ধিষ্ণু পরিবারগুলিতে বিভিন্ন শৈলীর ঠাকুরদালান গড়ে ওঠায় ক্রমেই হারিয়ে যেতে থাকে বাংলার নিজস্ব চণ্ডীমণ্ডপ। কালক্রমে টিকে থাকা দু’একটি চণ্ডীমণ্ডপ ধরে রেখেছে বাংলার সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের নমুনাযেমন, হুগলি জেলার আঁটপুরের মিত্র পরিবারের সুবৃহৎ চণ্ডীমণ্ডপটি। স্থাপত্যটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংরক্ষিত হেরিটেজ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। কাঁঠাল কাঠের তৈরি মূল কাঠামোটির উপরে রয়েছে দারুভাস্কর্য। আজও আটচালাটিতে খড়ের চাল রয়েছে। ঠিক যেমনটা ছিল অতীতে।

Durgapuja Of Famous Families Of West Bengal-Ananda Utsav 2017

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের ঠাকুর দালান।

শোনা যায়, সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের প্রাচীন আটচালাটি ছিল অলঙ্কৃত কাঠের থামের উপরে ছিল হোগলা পাতার ছাউনি। ঠিক যেমনটা দেখা যেত প্রাচীন বাংলার চণ্ডীমণ্ডপে। পরে বাঁশের কাঠামোর উপরে ছিল টালির ছাদ। মেঝে এবং সিঁড়ি ছিল মাটির। তারও পরবর্তী সময়ে আটচালার আদলেই তৈরি হয় কংক্রিটের আটচালা। আটচালার সামনে ছিল ষোলোটি থামযুক্ত নাটমন্দির। কবেই ভেঙে পড়েছে সেই নাটমন্দিরের ছাদ। কালের সাক্ষ্য বহন করে আজ দাঁড়িয়ে মাত্র দশটি থাম। সাবেক প্রথা অনুসারে এই পরিবারে পুজো হয় কবি বিদ্যাপতি রচিত দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী মতে। আর সেই পদ্ধতি অনুসারে প্রতি বছর নতুন মণ্ডপ তৈরি করে পুজোর বিধান আছে তাই সাবর্ণপাড়ার আটচালা বাড়িতে আজও পুজো হয় আটচালাতেই, ঠাকুরদালানে নয়।

Durgapuja Of Famous Families Of West Bengal-Ananda Utsav 2017

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দুর্গাদালান।

বাংলার অন্যতম পঙ্খ অলঙ্কৃত দুর্গাদালান রয়েছে কৃষ্ণনগরে। নদিয়া রাজবংশের আদি পুরুষ ভবানন্দ মজুমদার মাটিয়ারিতে বসবাস করলেও তাঁর উত্তরপুরুষ রাঘব রায় মাটিয়ারি থেকে রেউই গ্রামে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। পরে মহারাজ রুদ্র রায়ের আমলে স্থানটির নতুন নামকরণ হয় কৃষ্ণনগর। তিনি ঢাকা থেকে আলাল বক্স নামক এক স্থপতিকে আনিয়ে চকবাড়ি, কাছারিবাড়ি, হাতিশালা, আস্তাবল, নহবত্‌খানা এবং পঙ্খ অলঙ্কৃত দুর্গাদালান তৈরি করানরুদ্র রায়ের উত্তরপুরুষ মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় মহা সমারোহে তাঁর এই পারিবারিক পুজো করতেন। তিনিই প্রথম সর্বসাধারণের মধ্যে দুর্গোত্সবের প্রচলন করেন যা পরবর্তী কালে সর্বজনীন রূপ লাভ করে। রাজবাড়ির পঙ্খ অলঙ্কৃত দুর্গাদালানে অধিষ্ঠান দেবী দুর্গার। যাঁর প্রচলিত নাম রাজরাজেশ্বরী

Durgapuja Of Famous Families Of West Bengal-Ananda Utsav 2017

শোভাবাজার রাজবাড়ির ঠাকুর দালান। 

১৭৫৭ সালে মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব তাঁর শোভাবাজারের বাড়িতে সাড়ম্বরে শুরু করেছিলেন দুর্গোৎসব। সে বার পুজোর আগে হাতে সময় ছিল খুবই কম! তবু নবকৃষ্ণ বাড়িটির আমূল পরিবর্তন করেছিলেন। দিল্লি থেকে বিশিষ্ট স্থপতি এনে তৈরি করান এ বাড়ির নাচঘর, ডিনাররুম, দেওয়ানখানা আর পঙ্খের কাজযুক্ত সাত খিলানের ঠাকুরদালান। এ সবের অবশ্য একটা কারণ ছিল! সে বছর তাঁর পুজোয় বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বয়ং লর্ড ক্লাইভ। তবে শোনা যায় বাড়িটি আগে ছিল শোভারাম বসাকের। পরবর্তী কালে বাড়িটির মালিক হন রাজা নবকৃষ্ণ।

স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন-এর উল্টো দিকে কবিরাজ রো দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সামনের গোপালচন্দ্র লেনের বদনচন্দ্র রায়ের বাড়ির ঠাকুর আজও সকলের নজর কাড়ে। স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন-এর উল্টো দিকে সঙ্কীর্ণ, মলিন কবিরাজ রো দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সামনের গোপালচন্দ্র লেনের পাঁচটি খিলান বিশিষ্ট দু’দালানের ঠাকুর দালানটিতে উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের ছাপ স্পষ্টসামনের উঠোনে ছোট ছোট থামের উপরে দেখা যায় ঢালাই লোহার অলঙ্করণ যুক্ত আলোকস্তম্ভ। এখানে অতীতে গ্যাসের আলো জ্বলত। এখনও পুজোর সময় জ্বলে সাবেক গোল আলোর সারি। তেমনই ঠাকুরদালানে আজও দেখা যায় সাবেক ঝাড়বাতি, ফানুস। শুধু মোমবাতির জায়গায় এসেছে বৈদ্যুতিন আলো।

Durgapuja Of Famous Families Of West Bengal-Ananda Utsav 2017

শিবকৃষ্ণ দাঁয়ের বাড়িক ঠাকুর দালান। 

জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁয়ের বাড়িতে ঢুকলে মনে হতেই পারে সেকেলে ইউরোপীয় অপেরা হাউজের ব্যালকনির মতো। স্থাপত্যে প্রচলিত দালানের চেয়ে একে বারেই আলাদা দাঁ পরিবারের ঠাকুরদালানটিতার অবশ্য একটা কারণও ছিল। শোনা যায়, এই পরিবারের এক আদিপুরুষ কীর্তিচন্দ্রের অভিনয়ের শখ ছিল। ওই দালানের সামনের অংশে এককালে যাত্রা এবং নাটক অভিনীত হত।

তবে সময়ের প্রভাবে বেশ কিছু পরিবারে পুজো বন্ধ হলেও রয়ে গিয়েছে স্থাপত্য বৈচিত্রে ব্যতিক্রমী কিছু দালান। যেমন বাগবাজার স্ট্রিটে পশুপতি বসু, নন্দলাল বসুর ইতিহাস প্রসিদ্ধ বাড়ির দালানটিতেমনই পাথুরিয়াঘাটার মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের ‘টেগোর প্যালেস’-এর পাঁচ খিলানের দালানটিতে সাবেক স্থাপত্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধনের ছাপ স্পষ্ট। কলকাতার বেশির ভাগ ঠাকুরদালানে দরজা না থাকলেও এখানে দরজার উপস্থিতি লক্ষণীয়। তেমনই মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মার্বেল প্যালেসে দুর্গাপুজো না হলেও কালীপুজো, সরস্বতী পুজো হয়। চকমেলানো বাড়ির এক দিকে ঠাকুরদালানের দেওয়ালে দেখা যায় রোমান বনদেবী ডায়ানার পৌরাণিক কাহিনির ম্যুরাল। তেমনই দু’ধারে চোখে পড়ে রামায়ণ ও গ্রিক পুরাণের মিশেল নির্মিত নানা মূর্তি। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের এমন মেলবন্ধন সহজেই শিল্পরসিকের মন টানে।

ঠাকুরদালান মানেই অতীত আর বর্তমানের মাঝে এক সেতু। অতীতের পুজো আর আজকের পুজোর মাঝে এক নিবিড় যোগসূত্র!

সর্বশেষ সংবাদ

দীপাবলি মানে অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরা। ফুল, প্রদীপ, রঙ্গোলির রঙে মনকে রাঙিয়ে তোলা।
হেডফোন বা হেডসেট এমন বাছুন যা কি না আপনার কান আর শরীরকে কষ্ট না দেয়।
ছবি তোলার প্রথম ক্যামেরা কোডাক যে দিন বাজারে এল বিক্রির জন্য, সেই ১৮৮৮ সালে। পাল্টে গেল ছবি তোলার সংজ্ঞাই।
আগে এই প্রথা মূলত অবাঙালিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন লক্ষ্মীলাভের আশায় বাঙালিরাও সমান ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
ধন কথার অর্থ সম্পদ, তেরাসের অর্থ ত্রয়োদশী তিথি।
এই একবিংশ শতাব্দীতে ১৫৯০-এর একটুকরো আওধকে কলকাতায় হাজির করেছেন ভোজনবিলাসী শিলাদিত্য চৌধুরী।
আমেরিকার সেন্ট লুইসের প্রায় ৪০০ বাঙালিকে নিয়ে আমরা গত সপ্তাহান্তে মেতে উঠেছিলাম দূর্গা পুজো নিয়ে।
শারদীয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই আগমনীর বার্তা নিয়ে হাজির দীপান্বিতা।