রণরঙ্গিনী থেকে উমা

বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১৫:২৯:৫৬ | শেষ আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১৩:৫৩:২০
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তন ঘটেছে দুর্গোৎসবেরও। লিখছেন বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য
শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো।

বাংলায় দুর্গাপুজোর প্রচলন ঠিক কবে থেকে হয়েছিল সে কথা সঠিক ভাবে নির্ণয় করা না গেলেও প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন থেকে প্রমাণ মেলে যে শুঙ্গ এবং গুপ্ত যুগেও দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল। তবে সে কালে তিনি পূজিত হতেন মহিষমর্দিনী রূপে। পরবর্তীকালে পাল ও সেন যুগে দুর্গাপুজোর প্রচলন বৃদ্ধি পায়। প্রাচীন মূর্তিগুলিতে দেবীর দু’টি কখনও বা চারটি হাত দেখা যায়। এই সব মূর্তিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একটি হাতে শূল, অন্যটিতে তিনি মহিষরূপী অসুরকে চেপে ধরে বধ করছেন। পরবর্তী কালে তাঁর হাতের সংখ্যাও যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনই যোগ হয় তাঁর বাহন সিংহটি। এর সঙ্গে মহিষরূপী অসুর বদলে যায় মানবরূপী অসুরে। বাংলার মঙ্গলকাব্যের প্রভাবে রণরঙ্গিনী চণ্ডী হয়ে উঠলেন ঘরের মেয়ে উমা। আর তাঁর স্বামী শিব যেন বাড়ির জামাই।

অতীতে দু্র্গোৎসব হত বসন্ত কালে। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে রাবণকে বধ করার আগে শ্রীরামচন্দ্র দেবীর অকাল বোধন করেছিলেন। প্রচলিত কিংবদন্তী বলে, ষোড়শ শতকে বাংলার বারো ভুঁইয়ার অন্যতম তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ শরৎকালীন দুর্গোৎসবের প্রচলন করেন। তার পরবর্তী কালে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কিছু রাজা এবং সম্ভ্রান্ত জমিদার শরৎকালে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুসারে কলিযুগে দুর্গোৎসবে রাজসূয় যজ্ঞের ফল লাভ হয়। তাই এক দিকে পুণ্যার্জনের আকাঙ্খায় অন্য দিকে আর্থিক সঙ্গতিপন্ন কিছু ধনী ব্যক্তির মান, মর্যাদা প্রতিপত্তি প্রদর্শনের প্রতীক হয়ে উঠলো দুর্গোৎসব। মধ্যযুগে বাংলায় যখন দেবীর মৃণ্ময়ী মূর্তির প্রচলন ঘটে সেই সময় দেবীর দু’পাশে দেখা যেত তাঁর দুই সখী জয়া ও বিজয়াকে। পরবর্তী কালে সেখানে স্থান পান সরস্বতী ও লক্ষ্মী। আজও পূর্ববঙ্গের কিছু প্রাচীন পুজোয় দেবীর পাশে দেখা যায় জয়া-বিজয়ার উপস্থিতি।

নদিয়া রাজবংশের আদি পুরুষ ভবানন্দ মজুমদার অন্নপূর্ণা পুজোর প্রচলন করেন। পরে কোনও এক সময়ে এই পরিবারে প্রচলন হয় দুর্গোত্সবের। ভবানন্দের উত্তরপুরুষ রাঘব রায় মাটিয়ারি থেকে রেউই গ্রামে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। রুদ্র রায় ঢাকা থেকে আলাল বক্স নামক এক স্থপতিকে আনিয়ে তৈরি করান পঙ্খ অলঙ্কৃত দুর্গাদালানটি।রুদ্র রায়ের উত্তরপুরুষ মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় মহা সমারোহে তাঁর এই পারিবারিক পুজো করতেন। তিনিই প্রথম সর্বসাধারণের মধ্যে দুর্গোত্সবের প্রচলন করেন যা পরবর্তী কালে সর্বজনীন রূপ লাভ করে। প্রচলিত দুর্গামূর্তির চেয়ে আলাদা এই মূর্তি। দেবী দুর্গার সামনের দু’টি হাত বড়, পিছনের আটটি হাত আকারে ছোট। দেবীর গায়ে থাকে বর্ম, এখানে তিনি যুদ্ধের বেশে অবতীর্ণা। পিছনে অর্ধগোলাকৃতি সাবেক বাংলা চালিবীর বাহন পৌরাণিক সিংহ। সামনে থাকে ঝুলন্ত অভ্রধারা। প্রতিমার সাজেরও কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। প্রচলিত ডাকের সাজের চেয়ে আলাদা। একে বলা হয় ‘বেদেনি ডাক’।

evolution-of-durga-puja-ananda utsav 2017

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের আটচালা

তবে বৃহত্তর কলকাতার মানচিত্রে দুর্গাপুজো শুরু করার কৃতিত্ব সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের। এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের আদি নিবাস ছিল হালিশহরে। যদিও জমিদারির মূল কাছারি ছিল বড়িশায়। সেখানেই ১৬১০-এ শুরু হয় দুর্গোৎসব। এই পরিবারের প্রাচীনতম পুজোটি হয় আটচালায়। এখানে পুজো হয় বিদ্যাপতি রচিত দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী মতে। যা বাংলার অন্যত্র প্রচলিত পুজোপদ্ধতির চেয়ে অনেকটাই পৃথক। আড়ম্বরপূর্ণ নানা আচার-অনুষ্ঠানের জন্য দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনীর পূজাপদ্ধতি এতটাই বৃহৎ এবং ব্যয়বহুল যে সে কালেও রাজা কিংবা বড় জমিদার ছাড়া এ পুজো করা সম্ভব ছিল না। মূল পুজো ছাড়াও নবপত্রিকা পুজো, মাতৃকা পুজো-সহ রয়েছে অন্যান্য দেবদেবীর বিস্তারিত পূজাপ্রণালী। এমনকী রয়েছে গজপূজা, অশ্বপূজা, এবং অস্ত্রপূজাও। সে কালে পুজোয় থাকত অন্নসত্র যাতে প্রজারা সকলেই দেবীর প্রসাদ পেতেন।

১৭৫৭ সালে মহারাজ নবকৃষ্ণ দেব তাঁর শোভাবাজারের বাড়িতে সাড়ম্বরে শুরু করেছিলেন দুর্গোৎসব। কিছু গবেষকের মতে, ক্লাইভকে খুশি করতে,পলাশির যুদ্ধের বিজয়োৎসব পালন করতেই নাকি নবকৃষ্ণ দুর্গোৎসবের আয়োজন করেছিলেন। পুরনো কলকাতায় একটা প্রবাদ শোনা যেত। ‘মা দুগ্গা নাচ দেখেন শোভাবাজার রাজবাড়িতে।’ পুজো উপলক্ষে বসত বাঈ নাচের আসর। আসতেন লখনউ,বারাণসী এবং দিল্লির সেরা বাঈজিরা। শোনা যায় কলকাতার দুর্গাপুজোয় প্রথম বাঈ নাচের আয়োজন করেছিলেন নবকৃষ্ণ। তাঁর পুত্র রাজকৃষ্ণও সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেছিলেন। রাজা নবকৃষ্ণের সাত রানির সন্তানাদি না হওয়ায় তাঁর দাদার পুত্র গোপীমোহনকে দত্তক নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৭৮২ সালে তাঁর সপ্তম স্ত্রীর গর্ভে রাজকৃষ্ণের জন্মের পরে নবকৃষ্ণের সম্পত্তি দু’ভাগ হয়েছিল। নবকৃষ্ণের আদি বাড়ির বিপরীতে রাজকৃষ্ণের জন্য তৈরি হয়েছিল নতুন এক প্রাসাদ। সেখানে ১৭৯২ থেকে আদি বাড়ির রীতি রেওয়াজ মেনেই শুরু হয় দুর্গাপুজো। রাজা রাজকৃষ্ণের পরিবারের প্রতিমাও একচালির সাবেক রীতির।

evolution-of-durga-puja-ananda utsav 2017

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি

কলকাতার প্রাচীন পারিবারিক পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম পাথুরিয়াঘাটা রামলোচন ঘোষের পরিবারের পুজো। আনুমানিক ১৭৮৩ সালে শুরু হয় এই পুজোটি। রামলোচন ও তাঁর দাদা রামপ্রসাদ ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংসের দেওয়ান। সে কালে পুজো দেখতে এসেছিলেন সস্ত্রীক ওয়ারেন হেস্টিংস। অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে আন্দুলের দত্ত চৌধুরী পরিবারের রামচন্দ্র দত্ত হাটখোলা অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে শুরু করেন দুর্গোৎসব। পরবর্তী কালে রামচন্দ্রের পৌত্র জগৎরাম দত্ত ৭৮, নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে প্রাসাদোপম এক ভদ্রাসন নির্মাণ করে সেখানেও শুরু করেন দুর্গোৎসব।

শান্তিপুরের প্রাচীন পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম চাঁদুনিবাড়ির পুজো। পারিবারিক ইতিহাস অনুসারে শ্রীচৈতন্যের গৃহশিক্ষক কাশীনাথ সার্বভৌম এই পুজো শুরু করেছিলেন। দেবী এখানে যুদ্ধবেশে অবতীর্ণা। গায়ে থাকে বর্ম। ষোড়শী কন্যা রূপে তিনি পূজিত হন। আজও প্রতিমা সাবেক মাটির সাজে সজ্জিত। প্রতিমার মুখটিও ‘খাস বাংলা’ রীতির। ১৭৬০ সাল নাগাদ রামচন্দ্র সেন হুগলি জেলার (বলাগড় থানার অন্তর্গত) সোমড়া গ্রামে দুর্গোৎসবের প্রচলন করেন। প্রতিমার তিনটি হাত দেখা গেলেও বাকি সাতটি হাত থাকে দেবীর দুই কাঁধের পাশেই, তবে তা চুলে ঢাকা থাকে। ডান দিকের এক হাতে খড়্গ, অন্যটিততে ত্রিশূল। বাঁ হাতে সাপের লেজ ও অসুরের কেশ ধরা থাকে। এ সবের পাশাপাশি বিষ্ণুপুরে মল্লরাজাদের দুর্গোৎসব, উত্তরবঙ্গের বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ি, মেদিনীপুরের মহিষাদল রাজবাড়ির পুজো বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

সময়ের বিবর্তনে বদলেছে দুর্গোৎসবের অনেক কিছুই। আজ উৎসবের আঙিনায় শুধুই টিকে আছে কিছু আচার অনুষ্ঠান আর ঐতিহ্যের রেশ।

 

 

সর্বশেষ সংবাদ

দীপাবলি মানে অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরা। ফুল, প্রদীপ, রঙ্গোলির রঙে মনকে রাঙিয়ে তোলা।
হেডফোন বা হেডসেট এমন বাছুন যা কি না আপনার কান আর শরীরকে কষ্ট না দেয়।
ছবি তোলার প্রথম ক্যামেরা কোডাক যে দিন বাজারে এল বিক্রির জন্য, সেই ১৮৮৮ সালে। পাল্টে গেল ছবি তোলার সংজ্ঞাই।
আগে এই প্রথা মূলত অবাঙালিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন লক্ষ্মীলাভের আশায় বাঙালিরাও সমান ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
ধন কথার অর্থ সম্পদ, তেরাসের অর্থ ত্রয়োদশী তিথি।
এই একবিংশ শতাব্দীতে ১৫৯০-এর একটুকরো আওধকে কলকাতায় হাজির করেছেন ভোজনবিলাসী শিলাদিত্য চৌধুরী।
আমেরিকার সেন্ট লুইসের প্রায় ৪০০ বাঙালিকে নিয়ে আমরা গত সপ্তাহান্তে মেতে উঠেছিলাম দূর্গা পুজো নিয়ে।
শারদীয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই আগমনীর বার্তা নিয়ে হাজির দীপান্বিতা।