আভিজাত্যে ব্যতিক্রমী কাশিমবাজার রাজবাড়ির পুজো

বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১২:২১:৫৮ | শেষ আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১৩:৫৩:২০
বর্গী আক্রমণের প্রভাবে সে সময় বাংলায় জনজীবন এবং পরিবেশ অশান্ত হয়ে উঠেছিল। লুঠপাট আর প্রাণহানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বাংলার আর্থ-সামাজিক অবস্থা।বিপদের আশঙ্কায় অনেকেই নিজেদের বাসস্থান ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিলেন।

কাশিমবাজার রাজপরিবারের আদি পুরুষ অযোধ্যারাম রায়ের বসবাস ছিল ভগবানগোলার কাছে বন্দর এলাকা বিরোজপুরে। আনুমানিক ১৭৪০ নাগাদ বর্গী আক্রমণের কারণে ব্যবসায় নানা সমস্যার সম্মুখীন হওয়ায় অযোধ্যারাম পূর্বপুরুষের বাসস্থান ছেড়ে কাশিমবাজারে এসে বসবাস স্থাপন করেন। তৈরি করেন এক প্রাসাদোপম ভবন আর ঠাকুরদালান। শোনা যায়, বিরোজপুরেও পারিবারিক দুর্গোৎসব হত। অযোধ্যারাম কাশিমবাজারে নবনির্মিত প্রসাদে সেই পুজোটি স্থানান্তরিত করেন।

Tradition And Aristocracy Of Cossimbazar Rajbari Durga Puja-Ananda Utsav 2017

পুজোর সেই ধারাবাহিকতা আজও অবিচ্ছিন্ন। তিন খিলানের ঠাকুরদালানের সংস্কার হলেও অতীতের আভিজাত্য অটুট।বর্তমানে বেশ কিছু ঝাড়বাতি আর ফানুস দিয়ে সাবেক ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধনে তা সাজিয়ে তোলা হয়েছে। রথের দিন কাঠামো পুজোর পরে ধাপে ধাপে হয় প্রতিমা নির্মাণপর্ব। দেবীর বোধন হয় আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদ থেকে। সে দিন থেকেই শুরু হয় পুজো আর চণ্ডীপাঠ।

এই পরিবারের প্রবীণ সদস্য প্রশান্তকুমার রায় বলছিলেন, ‘‘পুজোয় আগে পাঁঠাবলি হলেও এখন তা বন্ধ। এখনও অতীতের রীতি মেনে মহাস্নানের জন্য বিভিন্ন তীর্থের পবিত্র জল আনা হয়। অষ্টমী-নবমীতে হয় কুমারীপুজো। আর দশমীর দিন হয় অপরাজিতা পুজো ও কনকাঞ্জলি।’’ সাবেক প্রতিমাকে পরানো হয় জরি ও রাংতার ডাকের সাজ। প্রতিমাশিল্পীও বংশানুক্রমে মূর্তি তৈরি করে আসছেন। সাবেক বাংলা রীতির প্রতিমা। প্রতিমার সিংহ ঘোটকাকৃতির। শান্তির প্রতীক হিসেবে সিংহের রং এখানে সাদা। ঠাকুরদালানের উল্টো দিকেই রয়েছে মজলিসখানা। অতীতে সেখানেই বসত ধ্রুপদীসঙ্গীতের আসর, হত যাত্রাও। এখনও মাঝে মাঝে অনুষ্ঠান হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দফতরের উদ্যোগে প্রতি বছর অষ্টমীর দিনে বহু উৎসুক মানুষকে এই পুজো দেখানো হয়।

Tradition And Aristocracy Of Cossimbazar Rajbari Durga Puja-Ananda Utsav 2017

ভোগেও রয়েছে হরেক বৈচিত্র। পরিবারের বধূ সুপ্রিয়া রায় জানালেন, পুজোয় তিন দিনই ভোগ রান্না হয় ভোগমন্দিরে। সেখানে মাটির উনুনে কাঠের আঁচে ভোগ রান্না হয়। ব্রাহ্মণ পাচক ভোগ রাঁধলেও পরিবারের প্রথা অনুসারে বাড়ির বউরা পুজো উপলক্ষে বিশেষ ভোগ রাঁধেন। সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে। প্রতি বছর নতুন কিছু পদও রান্না করা হয়। এ ছাড়াও ভোগে থাকে শুক্তো, মোচা, ইত্যাদি নানা বাঙালি পদ। আগে সপ্তমীতে সাত মণ, অষ্টমীতে আট মণ, নবমীতে ন’ মণ চালের ভোগ দেওয়া হত। থাকে মাছের নানা পদ। তার মধ্যে লাউচিংড়ি, রুইমাছ, ইলিশমাছ, বোয়ালমাছ উল্লেখ্য। এ ছাড়াও থাকে ফুলকপি, আলু আর রুইমাছ, শুকনো লঙ্কা, পাঁচফোড়ন, সর্ষেবাটা দিয়ে রান্না বিশেষ একটি পদ— এক্কেবারে পুজোর ‘ডেলিকেসি’! একে বলে ঝাল-চচ্চ়ড়ি। এটি রান্না হয় লোহার কড়াইতে। এর স্বাদ মনে রাখার মতো।

স্মৃতিমেদুর সুপ্রিয়া দেবী শোনালেন তাঁর শাশুড়িমা রানি হেনারানি দেবীর মুখে শোনা এক কাহিনি। এক বার পুজোর মধ্যে ভোগমন্দির থেকেই কড়া সমেত চুরি গিয়েছিল এই ‘ঝাল-চচ্চড়ি।পরে অবশ্য খালি কড়াটি কাছেই জঙ্গলের মধ্যে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, এই ঝাল চচ্চ়ড়ির স্বাদগুণের জন্যই তা চোরের দ্বারা অপহৃত হয়েছিল!

Tradition And Aristocracy Of Cossimbazar Rajbari Durga Puja-Ananda Utsav 2017

দশমীতে দেওয়া হয় খই, চিড়ে দই ভোগ। আজও অব্যাহত কনকাঞ্জলি প্রথাটি। অতীতে প্রতিমা নিরঞ্জনেও ছিল বৈচিত্র। দু’টি নৌকো করে মাঝগঙ্গায় প্রতিমা নিয়ে গিয়ে তা আরতি করে বিসর্জন দেওয়া হত।

কালের গরিমায় হয়তো বিলিন হয়ে যায় সব কিছুই।শুধু থেকে যায় পুজোর পরম্পরা আর ঐতিহ্য।

সর্বশেষ সংবাদ

দীপাবলি মানে অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরা। ফুল, প্রদীপ, রঙ্গোলির রঙে মনকে রাঙিয়ে তোলা।
হেডফোন বা হেডসেট এমন বাছুন যা কি না আপনার কান আর শরীরকে কষ্ট না দেয়।
ছবি তোলার প্রথম ক্যামেরা কোডাক যে দিন বাজারে এল বিক্রির জন্য, সেই ১৮৮৮ সালে। পাল্টে গেল ছবি তোলার সংজ্ঞাই।
আগে এই প্রথা মূলত অবাঙালিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন লক্ষ্মীলাভের আশায় বাঙালিরাও সমান ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
ধন কথার অর্থ সম্পদ, তেরাসের অর্থ ত্রয়োদশী তিথি।
এই একবিংশ শতাব্দীতে ১৫৯০-এর একটুকরো আওধকে কলকাতায় হাজির করেছেন ভোজনবিলাসী শিলাদিত্য চৌধুরী।
আমেরিকার সেন্ট লুইসের প্রায় ৪০০ বাঙালিকে নিয়ে আমরা গত সপ্তাহান্তে মেতে উঠেছিলাম দূর্গা পুজো নিয়ে।
শারদীয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই আগমনীর বার্তা নিয়ে হাজির দীপান্বিতা।