করোনা-কাঁটায় বন্ধ পুজো, ওসলো-র ভরসা ভার্চুয়াল আমেজ

দীপঙ্কর মান্না

২০ অক্টোবর, ২০২০, ১৭:০৮
শেষ আপডেট: ২০ অক্টোবর, ২০২০, ১৭:১৮

আমার দুর্গোৎসব কাটবে টিভির পর্দা আর সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রেখে। 


পুজো এসে গেল প্রায়! শরতের নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘের ঘনঘটা আর মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠের সুর ভেসে আসা মানেই দুর্গাপুজোর শুরু। বাঙালির সবচেয়ে বর্ণাঢ্য উৎসব এই শারদীয় দুর্গাপূজা। আনন্দময়ী দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গার আগমন বার্তায় আনন্দমুখর হয়ে ওঠে বাঙালির মন।
 
কিন্তু এ বারের দুর্গোৎসব বাঙালির কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। বিশ্বব্যাপী করোনা অতিমারির ভয়ঙ্কর ব্যাপ্তি অনেকটাই ম্লান করেদিয়েছে উৎসবের আনন্দ। সরকারি বিধিনিষেধ আর সামাজিক দূরত্বের ঘেরাটোপে বাঙালির যেনমন খারাপের পালা। পুজো হবে ঠিকই, কিন্তু সীমাহীন আনন্দ আর উৎসবের মাতামাতি থাকবে অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত।
 
উত্তর মেরুর ছোট্ট দেশ নরওয়েতে বসে আমারও আজ মন খারাপ। এ বার এখানে পুজো বন্ধ। কর্মসূত্রে বিগত সাত বছর ধরে নরওয়ের রাজধানী ওসলো শহরের বাসিন্দা আমি। প্রত্যেক বছর এখানকার পুজোয় অংশগ্রহণ করি, আনন্দ করি। কোন বছরই বাদ যায়নি। আর দশমীর সন্ধ্যার পর থেকেই দিন গোনা শুরু করে দিই আগামী বছর মায়ের আসার অপেক্ষায়।
 
 
দুর্গা পুজোর হোম।
ওসলোর দুর্গাপুজো কলকাতার মতো জাঁকজমকপূর্ণ বা চাকচিক্যে মোড়া না হলেও আন্তরিকতার এতটুকু অভাব চোখে পড়ে না। এ যেন প্রবাসী বাঙালিদের পারিবারিক পুজো। কয়েকটা পরিবারমিলে পুজোর কটা দিন আনন্দে ভেসে যাই। প্রবাসে থেকে নির্দিষ্ট দিন বা তিথি মেনে পুজো করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। তাই আমাদের পুজোও হয় সপ্তাহান্তেই- শুক্রবার থেকে রবিবার। বলতে গেলে, পাঁচ দিনের আনন্দ আমরা তিন দিনেই পুষিয়ে নিই।
 
কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা আসে। সঙ্গে পুজোর প্রয়োজনীয় উপকরণ, উপচারও আসে কলকাতা থেকেই। গ্রীষ্মের ছুটিতে কলকাতা গেলে, সকলের ভাগেই কিছু না কিছু দায়িত্ব পড়ে সে সব নিয়ে আসার। তাই ফেরার পথে, খুশিমনেই লাগেজের ছোট্ট একটা জায়গা বরাদ্দ থাকে মা দুর্গার জন্য। তখন থেকেই পুজোর আগাম আনন্দ আর খুশিতে মনটা ভরে ওঠে।
 
করোনার ত্রাস আর লকডাউনের নিষেধাজ্ঞায় এ বছর গ্রীষ্মের ছুটি কেটেছে বাড়িতে বসেই। তখন থেকেই যেন মন খারাপের শুরু। একটা একটা করে চলে গিয়েছে বেশ কয়েকটা উৎসব। এ বার দুর্গাপুজোর পালা। কয়েক মাস ধরেই মনের মধ্যে ঘুরছে অনিশ্চয়তার কাঁটা। কী ভাবে কাটবে এ বারের দুর্গাপূজা?
 
প্রতি বছর পুজো শুরুর আগের রাত জেগে সাজানো, কাগজ কেটে কেটে দেওয়ালে পোস্টার লাগানো, সুন্দর শৌখিন বাক্সে মোড়া দুর্গামায়ের আবরণ উন্মোচন থেকে শুরু করে মাকে মঞ্চে বসানো, সব নিজেদেরই করতে হয়। এ যেন এক চেনা অনুভূতি, চেনা আনন্দ। লাইনে দাঁড়িয়ে মায়ের প্রসাদখাওয়া, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় নাচ-গান, দশমীর ঢাক, আরও কত কী! এবছর সেই অভ্যেসের ব্যাতিক্রম ঘটবে। মা দুর্গা থাকবেন বাক্সবন্দি। আর আমার দুর্গোৎসব কাটবে টিভির পর্দা আর সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রেখে। 
 
 
সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় নাচ-গান, দশমীর ঢাক, আরও কত কী!
 
নরওয়ের করোনা পরিস্থিতি বেশ নিয়ন্ত্রণে ছিল। ধীরে ধীরে নিয়মিত জীবনযাত্রায় ফিরছিল মানুষ। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের মোকাবিলায় নিয়মবিধি আরও কঠোর করল নরওয়ে সরকার। বড় অনুষ্ঠান বা জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা জারি হল। মাঝারি মাপের জমায়েতে অনুমতি থাকলেও স্যানিটাইজার এবং মাস্কের ব্যাবহার বাধ্যতামূলক। আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ তো অতিমারির শুরু থেকেই বহাল আছে।
 
 বাঙালির দুর্গোৎসব মানে সবাই মিলে আড্ডা, হইহুল্লোড় আর আনন্দ। সামাজিক দূরত্বের কথা মাথায় রেখে, মুখে মাস্ক পরে, মিনিটে মিনিটে হাতে স্যানিটাইজার লাগিয়ে করোনাসুরকে বধ করা যায় ঠিকই, কিন্তু দুর্গাপূজার আনন্দ সে ভাবে হয় না। তার উপর বিধিভঙ্গে বড়সড় জরিমানা এমনকি আইনানুগ ব্যবস্থার খাঁড়া। তাই স্বাস্থ্যবিধিকে মান্যতা দিয়ে, অনেক ভাবনাচিন্তার পরে পুজো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বারের ওসলোর দুর্গোৎসব তাই সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল। ভরসা শুধুই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা বাংলা চ্যানেলের পূজা পরিক্রমা।
 
 
অপেক্ষায় থাকলাম আগামী বছরের। মা দুর্গা আবার নিশ্চয়ই ওসলো আসবেন সপরিবারে। সব মন খারাপ ভুলে আমরা সবাই আবার মেতে উঠব উৎসবের আনন্দে।
 
 
 
ছবি সৌজন্যেঃ অঙ্কিত বন্দ্যোপাধ্যায়