দশমীতে মাকে বরণ করে সিঁদুর খেলি, লোকে দেখে বলে শ্বেতা বিবাহিত!

শ্বেতা ভট্টাচার্য্য

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২২:২৩
শেষ আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২০ ১২:৫৮

সারা বছর যতই শপিং হোক, পুজোয় নতুন জামা চাই-ই। এ বছরে এখনই তিনটে জামা হয়ে গিয়েছে। তার মধ্যে একটা সারারা।


এই চারটে দিনের অপেক্ষায় সারা বছর। ভাবছেন পুজো দেখতে? একেবারেই না। মনের সুখে পেটপুজো করব বলে! পুজো মানে এ বেলা ও বেলা, মোদ্দা কথা সমস্ত বেলাই শুধু খাওয়া আর খাওয়া। তার পরেও আমি এত রোগা! সবার বিস্ময়। আমি কী করব, বলুন? তাই বিশ্বাস করুন বা না করুন, আমার পুজো প্রাণ ভরে যা ইচ্ছে তাই-ই খাওয়ার দিন। একটা দিন, একটা মুহূর্তেও বাড়ির একটা কিচ্ছু দাঁতে কাটি না!
বাড়িতে কোনও রান্নাবান্নাও হয় না। পেটপুজোর পরেই আমার নজর পোশাকের দিকে। এখনও, পুজোয় আট থেকে ন’টা জামাকাপড় হবেই! দুটো দেয় মা-বাবা। বাকি করি আমি নিজেই। সারা বছর যতই শপিং হোক, পুজোয় নতুন জামা চাই-ই। এ বছরে এখনই তিনটে জামা হয়ে গিয়েছে। তার মধ্যে একটা সারারা।
পরোটা দিয়ে ষষ্ঠীর শুরু...
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বসতে না বসতেই চলে আসবে গরমাগরম পরোটা-তরকারি। মায়ের হাতের নয়, পাড়ার দোকানের! ভর পেট সেই খাবার খেয়ে সকাল বেলাতেই বেড়িয়ে পড়ি। সঙ্গে থাকেন মা, বেস্ট ফ্রেন্ড দেবযানী, ওর মা আর বউদি। আমি ঠাকুর দেখতেও প্রচণ্ড ভালবাসি। প্যান্ডেলে গেলে ভিড় হয়ে যায়। সবাই অটোগ্রাফ চায়। আমার সে সব নিয়ে একটুও মাথাব্যথা নেই। সবাইকে সামলাতে সামলাতেই দিব্য ঠাকুর দেখা হয়ে যায়। এই দিন জিন্স, টপে ষোড়শী।
ষষ্ঠীর দুপুরটাই যা ব্যতিক্রম। এই একটা দিন আমি বাড়ির খাবার খাই। একটু বিশ্রাম। তার পর বিকেলে সেজেগুজে আবার প্যান্ডেল হপিং। যদিও খুব বেশি সাজি না। ছোট্ট টিপ, হালকা লিপস্টিক আর মাস্কারা, আমার সাজ শেষ! রাতের মেনুতে বিরিয়ানি মাস্ট। প্রতি বছর আমার পুজো উদ্বোধন বিরিয়ানি দিয়ে।
কচুরি ছাড়া সপ্তমী...!
ষষ্ঠীর রাত কেটে সপ্তমীর সকাল। আমার পাতে ধোঁয়া ওঠা কচুরি আর তরকারি। উমমমম....বলতে বলতেই জিভে জল চলে এসেছে। পেট ভরে কচুরি, তরকারি খেয়ে যথারীতি মা-বাবা, বন্ধু, ওর মা, দুই বউদিকে নিয়ে রাস্তায় টো টো কোম্পানি। কচুরি-তরকারি তখনও ভাল করে হজম হয়নি। আমি ছুটছি ফুচকা, আইসক্রিমের দিকে! পায়ের পাতা ছুয়ে লং ড্রেস। হাওয়ায় উড়ছে অবাধ্য চুল।
প্যান্ডেলে গেলে ভিড় হয়ে যায়। সবাই অটোগ্রাফ চায়।
এই দিন দুপুরে আর বাড়ির খাওয়া নেই। পাড়ার নামী রেস্তরাঁয় দুর্দান্ত ‘থালি’ করে। সবার সেটা চাই-ই। বিকেলে আবার ঠাকুর দেখার পালা। রাতের খাওয়া মায়ের পছন্দ অনুযায়ী, মিক্সড ফ্রায়েড রাইস আর চিকেন ভর্তা। পেট ভরতেই ঘুমে চোখের পাতা ভারী। সারা দিনের হুল্লোড়ের পর ক্লান্ত পায়ে বাড়ির পথ ধরা। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় আরাম করে বসে ঘরোয়া গল্পগুজব। দিনের শেষে অবশেষে ঘুমের দেশে। 
পরের দিন অষ্টমী! সকাল সকালে উঠতে হবে তো?
অতিমারির আগেই মুখ ঢেকেছি মাস্কে...
অঞ্জলি দেব....এই তাড়াতেই সাত সকালে ঘুম ভাঙে। ঝটপট স্নান সেরে পাট ভাঙি মায়ের দেওয়া নতুন শাড়ির। পুজো সারা হলেই কচুরি-তরকারি। আর মিষ্টিমুখ অষ্টমী স্পেশ্যাল মালপোয়া দিয়ে! খাওয়াদাওয়ার পাট চুকলেই এ দিন আমরা জ্যেঠুর বাড়ি। জ্যেঠু নেই। কিন্তু প্রতি বছর ওঁর বাড়িতে হুল্লোড় আছে। সমস্ত ‘তুতো’ ভাই-বোনেরা তাঁদের স্বামী, স্ত্রী, ছানাপোনা মিলে বিশাল গেট টুগেদার। খাওয়ার লিস্টি আর নাই বা দিলাম। বুঝতেই পারছেন, এলাহি আয়োজন হয় এ দিন। সব মিটতে মিটতে বিকেল। আমরা আবার ঘরের পানে।
বাড়ি ফিরে ছোট্ট পাওয়ার ন্যাপ। রাত আন্দাজ আটটা। পাতিয়ালা-সালোয়ারে আমি অষ্টাদশী! মা-বাবা, দুই দাদা, বউদি, ছোড়দার পুঁচকে ছেলেকে নিয়ে ভাড়ার গাড়ি দক্ষিণ কলকাতামুখী। সঙ্গে ভিআইপি পাস থাকে। না থাকলেই বা কী? আমার ঠাকুর দেখা কে বন্ধ করবে? এমনও হয়েছে, ভিআইপি কার্ড হারিয়ে ফেলেছি। পড়ে গিয়েছে হয়ত ভিড়ের ধাক্কায়। আমি স্কার্ফে মুখ ঢেকে ঢুকে গিয়েছিপ্যান্ডেলে! তাই তো মজা করে বলি, অতিমারির আগেই ঠাকুর দেখতে গিয়ে মুখ ঢেকেছি মাস্কে।
ওহো! রাতের খাওয়ার কথাই তো বলা হল না! এদিন পাতে খিচুড়ি, পাঁচ রকম ভাজা, ইলিশ মাছ ভাজা মাস্ট। যদিও আমি ততটাও খিচুড়ি ভক্ত নই। তার পর ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন বা অন্য কোনও চাইনিজ ডিশ। বাড়ি ফিরি যখন হাত ঘড়ি জানান দেয়, রাত দুটো কি আড়াইটে।
নবমী মানেই শ্রীভূমির আলুর পরোটা... 
অষ্টমীর রাতে ভিড়ের চোটে অনেক ঠাকুর মিস হয়। তাদের দেখব না, হয়? আমার প্রতিমা দর্শন নবমীর সকাল থেকেই। লাইটিং মিস করি ঠিকই। কিন্তু ফাঁকায় ফাঁকায় ঠাকুর তো দেখা হয়। সকালের সাজ পাশ্চাত্য ঘেঁষা। হয় লং ড্রেস নয় গোড়ালি কামড়ে থাকা টাইটস আর টপ।
গাড়ি নিয়ে প্রথমেই শ্রীভূমিতে। সেখানে একটা দোকান আছে, দুর্দান্ত আলুর পরোটা বানায়। ওটা ছাড়া নবমীর ব্রেকফাস্ট! ভাবতেই পারি না। এদিন আমার সঙ্গী মা-বাবা আর এক দিদি। মজার কথা শুনবেন? সকালে যে সব ঠাকুর বিনা লাইটিংয়ে দেখি দুপুরে ভূরিভোজ সেরে সন্ধেয় সেইগুলোই আবার দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরি উইথ লাইটিংয়ে! আমি তখন ‘সারারা’ সুন্দরী। এই করতে করতেই রাত নটা!
দশমীর দিন মুখে হাসি নিয়ে মাতি সিঁদুর খেলায়।
মাকে বরণ, সিঁদুরখেলা...শ্বেতা বিবাহিত?
দশমীর দিন একটু বেলা করেই উঠি। এ দিন আর ঠাকুর দেখা নেই। মনটাও হাল্কা ভারী। সকাল সকাল স্নান সেরে বেলা বারোটার মধ্যে বারোয়ারি তলায়। মা ফিরবেন কৈলাসে। বরণ করে রওনা করিয়ে দিতে হবে যে তাঁকে...! চোখ জল মুখে হাসি নিয়ে মাতি সিঁদুর খেলায়। তাতেও সমস্যা!একে শুটিংয়ের দৌলতে চওড়া করে সিঁদুর পড়তে হয়। সেই নিয়েই বাড়ি ফিরি। তার উপর আবার এঁয়োদের মতো বরণ করি মাকে!
তাহলে কি বিয়ে হয়ে গিয়েছে শ্বেতার? ঢি ঢি পড়ে যায় পাড়ায়। শ্বেতা বিবাহিত! গুঞ্জন আরও গাঢ় হয়। আমার তাতে থোড়াই কেয়ার। মনের মতো করে মাকে বিদায় জানাই। এক বছরের জন্য। সিঁদুর মেখে ভূত হয়ে বাড়ি ফিরি। তার পরেইমন খারাপ। চুপ করে বসে থাকি নিজের ঘরে। আবার বচ্ছরান্তের প্রতীক্ষা!
সন্ধে নামলে বাড়ির রীতি মেনে স্থানীয় পুকুর ঘাটে যাই। প্রতিমা জলে পড়ে। আধ ডোবা মুখ দেখে বিজয়া শুরু। সবাই মিলে যাই ‘অন্য মা’ মানে ঠাকুমার বাড়ি। ঠাকুমা নেই। কিন্তু ওঁর বাড়ি দিয়েই প্রণাম পর্বের আরম্ভ। হাতে থাকে মিষ্টি, নাড়ু। ঠাকুমার বাড়ির পরেই যাই জ্যেঠুর বাড়ি। সেখানে বিজয়া সেরে নিজেদের বাড়িতে। এ দিনও বাইরের খাবারই খাই। তবে গিয়ে নয়, ছোড়দা নিয়ে আসে বাড়িতে।
আমি ভীষণ দলছুট। সবাই বলে, পাঁচদিন ছুটি। শুটিং নেই। জমিয়ে ঘুমোব, বাড়িতেই থাকব। আমি ছুতো খুঁজি, কী করে প্রাণশক্তি নিংড়ে নেব পুজোর ভিড়, প্যান্ডেল হপিং, খাওয়াদাওয়া, সাজগোজ থেকে। খুব ভিড়ে ঢুকতে আমারও ভাল লাগে না। কিন্তু ভিড় দেখতে ভীষণ ভাল লাগে। কত রকমের মানুষের ঢল! কতকথা, প্রাণের স্পন্দন শহরের আনাচে-কানাচে। কেমন যেন নেশার মতো টানে!
দশমীতেই পাড়ার ঠাকুরের বিসর্জন হয় না। ওই রাতে নিজের পাড়ার প্যান্ডেলে নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর রাত। একটু করে রাত বাড়ে। হাল্কা করে গান চলে। প্রতিমার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অন্যমনস্ক। ঘট নাড়িয়ে দিয়েছে মানেই ‘মা’ আর নেই!
এ বছর সবাই করোনাকে নিয়ে ভাবছে, ভয় পাচ্ছে। আমার কান্না পাচ্ছে, যদি না বেরোতে পারি? মা বলে দিয়েছেন, এ বার আর সারাক্ষণ বাইরে নয়! মাথায় হাত। দমটাই তো আটকে যাবে! তার মধ্যেই এক টুকরো খুশি, দশমীর বিকেলে পাড়ার ঢাকে বোল তুলবে শ্বেতা ‘যমুনা ঢাকি।’