দুর্গা রোগা না মোটা সেটা কি কেউ কখনও চোখে দেখেছে?

স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়

০৯ অক্টোবর, ২০২০, ১৯:৩০
শেষ আপডেট: ০৯ অক্টোবর, ২০২০, ১৮:২৯

নিজের চেহারাকে অস্বীকার করাটা বোকামি আর আত্মবিশ্বাসের অভাব ছাড়া আর কিছুই নয়।


“মোটা কিন্তু মুখটা মিষ্টি।”
 
“একটু রোগা হলে জামাটা বেশি মানাতো।”
 
এই কথাগুলো ‘মোটা মেয়ে’দের কাছে কিছুটা রুটিনের মতো। খুব অসুখ হলে যেমন তেতো ওষুধটা অনেক কষ্টে নাক-মুখ কুঁচকে গিলে ফেলতে হয়, এই কথাগুলোও কিছুটা সেরকম। ইচ্ছে না হলেও শুনতে হয়। ‘লাভলি’ থেকে ‘ফেয়ার’ বিদায়নিল, ‘বডি শেমিং’ নিয়ে গলা ফাটানো হল, তবু সৌন্দর্যের মিথ্যে ধারণা আঁকড়েই দিন কাটছে সমাজের। ছিপছিপে চেহারা ছাড়া কি সুন্দর হওয়া যায়? সবার সামনে মেলে ধরা যায় নিজেকে? প্রশ্নের জবাব দিলেন অভিনেত্রী সঙ্ঘশ্রী। নিজের মতোকরে, ভালবেসে।
 
 
বর্তমানে তাঁকে দেখা যাচ্ছে, জি বাংলার ‘কী করে বলব তোমায়’ ধারাবাহিকে। মূল চরিত্রে অভিনয় করছেন না তিনি, কিন্তু হিন্দি-বাংলা মেশানো সংলাপে আর অভিনয়ের গুণে ‘ডলি সেন’-এর চরিত্রে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন সহজেই। মনে করিয়ে দিয়েছেন, নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে সব কাজই সুন্দর, সহজ ভাবে করা যায়। রোগা হয়ে অন্য লুকে নতুন কিছু করতে চাওয়া নিয়ে সোজাসাপ্টা আপত্তি জানালেনসঙ্ঘশ্রী। তিনি বলেন, “নিজের চেহারাকে অস্বীকার করাটা বোকামি আর আত্মবিশ্বাসের অভাব ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি অনেক সিনিয়র অভিনেত্রীদের চিনি, যাঁরানা খেয়ে, জিম করে রোগা হয়েছেন। কিন্তু দেখা যায়, শেষ পর্যন্ত তাঁরা কোনও মেগা সিরিয়ালে মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করছেন। কেন তাঁরা সাহস করে ছবিতে অন্য রকম পার্টকরতে পারেন না? আমার এগুলো দেখে খুব দুঃখ হয়।”
 
দুর্গাপুজো হাতে গুনে আর এক মাস। উমার আগমনীর আগে শরীরের সব মেদ ঝরিয়ে নিজেকে ‘সুন্দর’ দেখাতে মরিয়া অনেকে। ঠিক তখনই সঙ্ঘশ্রী একটি ফটো শুটে ধরা দিলেন নতুন রূপে। কপালে বড় সিঁদুরের টিপ, সিঁথি ভর্তি সিঁদুর, পরনে লালপাড় সাদা শাড়ি, মাথায় উঠেছে ঘোমটা। চোখে ঘন কাজল আর খোলা চুলে যেন তিনি সাক্ষাৎ দুগগা। তবে কি উমার রূপ নিয়েছেন তিনি? উত্তরে বললেন, “আমি দুর্গা সাজিনি। আমি তো একজন মা। তা-ই সেজেছি। চারদিকে এই রোগভোগ থেকে সেরে উঠে পৃথিবী যাতে সুস্থ হয়, মায়ের রূপে সেই কামনাই করছি। উমা আসছে তাঁর ছেলেমেয়ে নিয়ে, মা হয়ে বরণ করে নেব তাঁকে।”

প্রত্যেকের লড়াই ভিন্ন, প্রত্যেকেই নিজের মতো করে শ্রেষ্ঠ।

বলিউড হোক কিংবা টলিউড, ফটোশুট বলতেই ছিপছিপে চেহারার নায়িকা বা মডেলের একচেটিয়া রাজত্ব। গুটিকয়েক সংস্থা ‘প্লাস সাইজ’মডেল নিয়ে কাজ করলেও মুলস্রোতে এই ট্রেন্ড চালু হওয়া এখনও আকাশকুসুম। তবে সঙ্ঘশ্রী কিন্তু এই ব্যকরণ মোটেই মানেন না। তাঁর কথায়, “দুর্গা রোগা না মোটা সেটা কি কেউ কখনও চোখে দেখেছে? ইদানিং সব চ্যানেলেই দুর্গার চরিত্রের জন্য কোনও নায়িকা বা নায়িকা সুলভ চেহারার মেয়েকে বেছে নেওয়া হয়। মৃৎশিল্পীরাও সব সময় সে ভাবেই মূর্তি গড়েন। কিন্তু মা দুর্গা দশ হাতে এতগুলি অস্ত্র নিয়ে কি সত্যি এত রোগা চেহারায় যুদ্ধ করেছেন? ‘রোগা মানেই সুন্দর’, এই গতানুগতিক ধারণা থেকেই মা দুর্গাকেও সে ভাবেই রূপ দিয়ে এসেছি আমরা।”
 
সঙ্ঘশ্রী মনে করেন প্রতিটি মেয়েই দুর্গা। তাই রোগা-মোটার তুচ্ছ বেড়াজালে তাঁদের বেঁধে রাখা সম্ভব নয়।
প্রত্যেকের লড়াই ভিন্ন, প্রত্যেকেই নিজের মতো করে শ্রেষ্ঠ। নিজের চেহারা নিয়ে তাই অকপট অভিনেত্রী। নায়িকা হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে তাঁকে দেখা যায় না। খুব সচেতন ভাবেই বললেন, “আমি জানি আমাকে কেমন দেখতে। আমাকে তাই কখনও নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য ডাকা হয়নি। আমরা খুব কম বয়স থেকেই মা, কাকিমা, বৌদির চরিত্রে অভিনয় করি। তবে ছবি করার ক্ষেত্রে অনেক সময়ে অন্য রকম চরিত্র করার সুযোগ হয়।”

করোনা আবহে বাইরে বেরোনোর প্রশ্ন নেই, তাই বাড়িতে বসেই আড্ডা দেবেন।
 
নিজেকে নিজের মতো করেই ভালবাসেন সঙ্ঘশ্রী। নিজেকে বদলাতেও চাননা কোনও ভাবেই। তাঁর মতে, চেহারা যেমনই হোক, আত্মবিশ্বাসের থেকে বড় প্রসাধনী আর কিছু হয় না।পুজোর আগে বেশ ফুরফুরে মেজাজে কাটছে। রোগা হওয়া, ডায়েট করা, এ সব নিয়ে ভাবছেন নামোটেই। বরং পুজোর ক’টা দিন মালদহে পরিবারের সঙ্গে কাটাতে চান। করোনা আবহে বাইরে বেরোনোর প্রশ্ন নেই, তাই বাড়িতে বসেই আড্ডা দেবেন। ইতিমধ্যেই কবে কী কী খাওয়া হবে, ফোনাফুনি করে সে সব প্ল্যানিংও সারা হয়ে গিয়েছে। 
পুজোয় নিজেকে অনন্যা করে তুলতে অনেকেই এখন জিমে ছুটছেন। কেউ কেউ আবার প্রিয় খাবার গুলোকেই কেটেবাদ দিয়েছেন ডায়েটের তালিকা থেকে। মোটা হলে কি আর নতুন জামাকাপড় পরে ভাল লাগে? শাড়ি থেকে ভুঁড়িউঁকি দিলে? সাধের হটপ্যান্ট পড়ে পা “থলথলে” মনে হলে?
 
এই প্রশ্নগুলোকেই কখনও তোয়াক্কা করেননি সঙ্ঘশ্রী। চেহারার আকৃতি বা ওজনের উপর যেফ্যাশন নির্ভর করে না, ক্যামেরার সামনে সাবলীল ভাবে দাঁড়িয়ে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন অভিনেত্রী। ‘মোটা মেয়ে’দের সাজগোজ যে আলাদা নয়, এই ফটোশুট তারই সাক্ষী। কুছ তো লোগ কহেঙ্গে… সেসব হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে নিজেকে ভালবাসাটাই এখন ‘ফ্যাশন’।