আজও ঐতিহ্য অমলিন শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজোয়

সায়ন্তনী সেনগুপ্ত

১১ অক্টোবর, ২০১৮, ২০:০০
শেষ আপডেট: ১২ অক্টোবর, ২০১৮, ১১:১২

বাঙালিদের দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এই পুজো একটা মাইলস্টোন! প্রথম পর্ব।


মনে হয় এই তো সে দিনের কথা। পুজো এসে গেলে বদলে যেত বিশাল বাড়িটার চেহারা। ঠাকুরদালান সংলগ্ন সারি সারি ঘর, যেগুলিকে পাঠশালা বলে সেখানে প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ হয়ে আসত। বার মহলের দিকের দোতলায় বেলোয়াড়ি কাচ দিয়ে ঘেরা নাটমন্দির থেকে ঠিকরে পড়ত শরতের রোদ। পুজোর সময় দুর্গাঠাকুরকে নিয়ে আসা হবে ঠাকুরদালানে। সেই সময় এই বৈষ্ণববড়ির নিত্যদেবতা রাধাকৃষ্ণ জিউকে তুলে দিয়ে আসা হবে নাটমন্দির সংলগ্ন নবরত্ন মন্দিরে। শক্তির দেবীদুর্গা আর প্রেমের দেবতার পুজো একই সঙ্গে এক ঠাকুরদালানে করা যাবে না। ভিড়ও হত ভীষণ এই পুজোয়। আত্মীয়স্বজন তো আছেই। পুজোর ক’টা দিন আশপাশের লোকও ভেঙে পড়ত বাড়িটায়। এত বড় পুজো তখনও পর্যন্ত দেখেনি এই তল্লাটের কেউ।

সুতানুটির লোকজন এই পুজোটাকে জানতেন গোরাদের পুজো বলে। কেন এই পুজোকে গোরাদের পুজো বলা হত তার একটা ইতিহাস রয়েছে। এই বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা নবকৃষ্ণ দেবের পূর্বপুরুষরা বিভিন্ন সরকারি এস্টেটে সরকারি চাকরি করতেন। এ জন্য তাঁদের অনেকের পদবি ছিল ব্যবহার্তা। এই পরিবারে প্রথম পুরুষ হিসেবে যাঁর নাম পাওয়া যায় সেই বিজয় হরিদেবের বাসস্থান ছিল দক্ষিণ ভারতে। কোনও এক সময়ে চোল রাজের সঙ্গে সংঘাতে তাঁর প্রাণসংশয় হয়। সেখান থেকে পালিয়ে তাঁরা চলে আসেন দিল্লি। এর পর নানা ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে একসময় তাঁরা কর্ণসুবর্ণতে বসতি স্থাপন করেন। পরে বর্গী আক্রমণের সময় নবকৃষ্ণ দেবের মা তাঁর সন্তানদের নিয়ে চলে আসেন তৎকালীন গোবিন্দপুরে।

এই সময় এখানে ফোর্ট উইলিয়াম তৈরির সিদ্ধান্ত নেন ইংরেজরা। সেই সময় সন্তানদের নিয়ে সুতানুটিতে চলে আসেন নবকৃষ্ণ দেবের মা।  নবকৃষ্ণ দেব ছিলেন যেমন করিৎকর্মা তেমনই বুদ্ধিমান এবং শিক্ষিত। ইংরেজি, ফার্সি, সংস্কৃত— এই তিন ভাষাতেই দখল ছিল তাঁর। ইংরেজরা যখন কলকাতায় প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার করছে তখন তাদের এমন এক জন লোক দরকার হল যিনি দেশীয় ভাষাটা জানেন। এই সূত্রেই তিনি ওয়ারেন হেস্টিংসের ফারসি শিক্ষক নিযুক্ত হন। কিছু দিনের মধ্যেই কর্মদক্ষতায় তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুন্সী নিযুক্ত হন।

আরও পড়ুন: সন্ধিপুজোয় এক মণ চালের নৈবেদ্য​

এর মধ্যে শুরু হল পলাশির যুদ্ধ। তত দিনে কোম্পানি বিষয়ক কাজকর্মে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেছেন মুন্সী নবকৃষ্ণ। পলাশির যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন ইংরেজদের প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন তিনি। কিছু কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, যুদ্ধে জয়লাভের পর সিরাজের বিপুল সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা যখন হয় তখন তার একটা বড় অংশ পুরস্কার স্বরূপ লাভ করেছিলেন নবকৃষ্ণ। আগেই শোভাবাজার অঞ্চলে শোভরাম বসাকের কাছ থেকে বিরাট একটি বাড়ি কিনেছিলেন তিনি। ঠিক করলেন, পলাশির জয়কে স্মরণীয় করে রাখতে এ বার সেখানে বিরাট বড় করে দুর্গাপুজো করবেন। শুধু তাই নয়, এই উপলক্ষ্যে যেমন সাহেবসুবোদের আমন্ত্রণ করে নিজের উন্নতির পথ প্রশস্ত করবেন, তেমনই বিলাসব্যসন আর আড়ম্বরে তাক লাগিয়ে দেবেন ওই এলাকার লোকেদের।

সাজ সাজ রব পড়ে গেল। যে পুজোর প্রধান অতিথি ক্লাইভ, সেই পুজো তো আর ছোট করে করা যায় না। দিল্লি থেকে লোক এনে ঢেলে সাজা হল বাড়ি। তৈরি হল বৈঠকখানা, খাওয়ার জায়গা, বিরাট নাচঘর। চারদিকে কাচ দিয়ে মোড়া সেই নাচঘর ছিল চোখধাঁধানো। নবকৃষ্ণদেব ঠিক করলেন, পুজো উপলক্ষে বাঈ নাচের আসর বসাবেন। শোনা যায় ক্লাইভ নাকি বিশেষ ভাবে সেই সময়ের বিখ্যাত নর্তকী নিকি বাইজিকে আনার ফরমায়েস করেছিলেন।

আলোকশোভা। শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রাচীন ঐতিহ্য। 

পুজো উপলক্ষে বাই নাচের আসর নবকৃষ্ণদেবই প্রথম বসিয়েছিলেন বলে শোনা যায়। এর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে রটে যায় দেবী কৈলাশ থেকে মর্ত্যে এসে নাচ দেখেন শোভাবাজার রাজবাড়িতে। রাজসিক অভ্যর্থনায় ক্লাইভকে নিয়ে আসা হল বটে, কিন্তু গোঁড়া হিন্দু নবকৃষ্ণ ম্লেচ্ছদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করে রাখলেন। জাতধর্ম নিয়ে যাতে কোনও সঙ্কট না হয় তার জন্য নাচঘরে ঢোকার আলাদা রাস্তা আগেই রাখা হয়েছিল। সেখান দিয়ে এলেন ইংরেজরা। নাচঘর এমন জায়গায় ছিল যে সেখান থেকে চণ্ডীমণ্ডপ সরাসরি দেখা যায়। এ ভাবেই পুজো দেখলেন ক্লাইভ এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। মূল বাড়ি তো দূরস্থান পুজো প্রাঙ্গনেও যাওয়ার অনুমতি ছিল না তাঁদের। এক দিকে আমোদপ্রমোদ-খানাপিনা-নাচ-গান, যাকে তৎকালীন হিন্দু সমাজের চোখে একেবারে মোচ্ছব বলত তাই চলতে লাগল। অন্য দিকে নিষ্ঠাভরে সনাতন পদ্ধতিতে পুজোও চলতে লাগল সমান্তরাল ভাবে। ধর্মভীরু এবং ততোধিক বুদ্ধিমান নবকৃষ্ণ দেব ভারসাম্য রক্ষার কাজটি করেছিলেন নিখুঁত ভাবে। শুধু প্রথম বার নয়। এর পর থেকে প্রতি বার অত্যন্ত ধুমধাম করে পালিত হতে লাগল শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। বস্তুত, বাঙালিদের দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এই পুজো একটা মাইলস্টোন!

আরও পড়ুন: বলির সময় পাঁঠাটি ছুটে চলে এল সামনে দাঁড়ানো রামদুলাল দে-র কাছে​

এর পর বিভিন্ন সময়ে গহরজান, মালকাজান, নুর বক্স প্রমুখ নামী নর্তকী এই বাড়িতে এসেছেন নাচ করতে। পুজোর সময় হত যাত্রাপালা আর কবিগানের আসর। নবকৃষ্ণ দেব তৎকালীন বাবু কালচারেরও এক জন প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, ভোলা ময়রার মতো কবিয়ালরা এখানে এসেছেন কবির লড়াই করতে। পরবর্তীকালেও পুজোর সময়ে যাত্রাপালা এবং নাটক নিয়মিত হত এখানে। শাহজাহান আলিবাবা অথবা বুড়ো শালিখের ঘাড়ে রোঁ এসবই পুজোর সময় দর্শক এবং অতিথিরা উপভোগ করতেন প্রাণভরে।

নবকৃষ্ণ দেবের সন্তান না থাকায় তিনি তাঁর দাদার ছেলে গোপীমোহন দেবকে দত্তক নিয়েছিলেন। এর কিছু দিন পরেই ১৭৮২-তে তাঁর সপ্তম স্ত্রীর গর্ভে রাজকৃষ্ণ দেব জন্মগ্রহণ করেন। এর পরই দেব পরিবারের সম্পত্তি দুই ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। পুরনো বড়ির দক্ষিণ দিকে বিশাল আর একটি বাড়ি তৈরি করা হল। ১৭৯২-এ সেখানেও শুরু হল দুর্গাপুজো। দু’-একটি ছোটখাটো তফাৎ ছাড়া আজও দুই বাড়িতে একই আচার-আচরণ রীতিনীতি মেনে নিষ্ঠা ভরে পুজো হয়।