বলির সময় পাঁঠাটি ছুটে চলে এল সামনে দাঁড়ানো রামদুলাল দে-র কাছে

সায়ন্তনী সেনগুপ্ত

০৫ অক্টোবর, ২০১৮, ২০:১১
শেষ আপডেট: ০৬ অক্টোবর, ২০১৮, ০৪:৩৯

ছাতুবাবু লাটুবাবুর বাড়িতে পুরোহিতের সাহায্যে কুমারী পুজো করেন মহিলারা।


রামদুলাল নিবাস বললে হয়তো কেউ চিনবেনই না বাড়িটা। বিডন স্ট্রিটে বড় রাস্তার উপর টুকটুকে লাল বাড়িটাকে কেমন যেন অন্য রকম, কেমন যেন খাপছাড়া মনে হয় আশপাশ থেকে। একটু কাছে গেলে দেখা যায়, গেটের মূল থামের উপর কারুকাজ করা শ্বেতপাথরের ফলকে রামদুলাল দে ছাড়াও লেখা রয়েছে আরও দুটো নাম— ছাতুবাবু আর লাটুবাবু।

প্রাচীন কলকাতার ইতিহাস এবং তৎকালীন বাবু কালচারের সঙ্গে এই দু’টি নাম অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে থাকলেও পরিবারের প্রাণপুরুষ বোধহয় ছিলেন ছাতুবাবু লাটুবাবুর বাবা রামদুলাল দে। তাঁর সময়েই এই বাড়িতে প্রথম দুর্গাপুজো শুরু হয়। কলকাতার আর এক বনেদি বাড়ির সাধারণ এক কর্মচারী হিসেবে যিনি কাজ করতেন, একসময় বুদ্ধি আর ক্ষমতাবলে তিনিই নাকি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার প্রথম লাখপতি। হাটখোলা দত্তবাড়ির মদনমোহন দত্তের কর্মচারী হিসেবে ডুবন্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজের নিলামে দত্ত বাড়ির হয়ে অংশ নিতে নিতে এই ব্যাপারে প্রভূত দক্ষতা অর্জন করেন রামদুলাল দে। এর পর মদনমোহন দত্তের উৎসাহে নিজের ব্যবসা শুরু করেন। শোনা যায়, আমেরিকান ব্যবসায়ীদের সঙ্গে লেনদেন চলত তাঁর। সদ্য স্বাধীন হওয়া আমেরিকা সেই সময় নিজেদের জন্য ব্যবসার নতুন ক্ষেত্র খুঁজছে। ১৭৯০-এর মধ্যে আমেরিকার সঙ্গে ইংরেজ শাসিত ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্যের ভিত সুদৃঢ় ভাবে স্থাপিত হয়ে যায়। এই সময় বস্টন, সালেম, ফিলাডেফিয়া, নিউ ইয়র্ক থেকে প্রচুর জাহাজ বাংলায় আসত লোহা, ব্রান্ডি, নানা সামুদ্রিক মাছ, গরুর মাংস, মোমবাতি— এ সব নিয়ে। বিনিময়ে কলকাতা থেকে তারা নিয়ে যেত চা, চিনি, নীল এবং নানা ধরনের বস্ত্র।

এই কাজে আমেরিকানদের সহায়তা করতেন এ দেশীয় ‘বেনিয়া’ সম্প্রদায়। রামদুলাল দে ছিলেন এঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। মারা যাওয়ার সময় তিনি বিপুল সম্পত্তি তাঁর দুই সন্তান ছাতুবাবু এবং লাটুবাবুর জন্য রেখে যান। আশুতোষ দেব ওরফে ছাতুবাবু এবং প্রমথনাথ দেব ওরফে লাটুবাবুর সময়েই এই পুজো বিখ্যাত হয়। এই দুই ভাই ছিলেন অতি শৌখিন এবং খরুচে। বুলবুলির লড়াই থেকে শুরু করে কুস্তির আখড়া, সবই ছিল এঁদের নেশা। এঁদের আমলে বাড়িটাকেও ঢেলে সাজান দুই ভাই। এখন তো বিরাট ঠাকুরদালান, চোখধাঁধানো ঝাড়বাতি ছাড়া আর সবই গ্রাস করে নিয়েছে সময়। গলির মোড় থেকে শেষ পর্যন্ত দুই দিক নিয়ে যে বিশাল বাড়ি ছিল, তা-ও আজ বহু শরিকে বিভক্ত। পুজোর সময় যাত্রা হত, বাঈ নাচ হত, কিছুই নেই সে সব আর।

আরও পড়ুন: ঠাকুরবাড়ির ঈর্ষা জাগাতে বেশ কয়েক বার ঘোরানো হত শিবকৃষ্ণ দাঁয়ের ঠাকুর

তবুও পুজো আছে। প্রতি বার পুজোর সময়ে জেগে ওঠে, সেজে ওঠে সারা বছর চুপচাপ পড়ে থাকা বাড়িটা। রথের দিন কাঠামো পুজোর পর প্রতিপদ থেকে শুরু হয় পুজো। বাড়ির প্রবীণ সদস্য কল্যাণ দেব জানালেন, প্রতিপদ থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত গৃহদেবতা শালগ্রাম শিলার পুজো করা হয়। তৃতীয়াতে দেবীকে আসনে বসানো হয়। পুরাণের বিধি মেনে শাক্ত শৈব এবং বৈষ্ণব মতে পুজো হয়। এই বাড়ির পুজোয় দেবীর পাশে লক্ষ্মী-সরস্বতী থাকেন না। পদ্মের উপর থাকেন জয়া আর বিজয়া। মা দুর্গার দুই সখী। আগে পুজোর সময় পাঁঠাবলি হত। বলা হয়, বলি দেওয়ার সময় পাঁঠাটি ছুটে চলে আসে সামনে দাঁড়ানো রামদুলাল দে-র কাছে। সেই থেকে এই পুজোয় পাঁঠাবলি বন্ধ হয়ে যায়। এখন আঁখ, চালকুমড়ো, শসা বলি হয় পুজোর তিন দিন।

এই বাড়িতে কুমারী পুজোও হয়। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলারা নিজের হাতে পুরোহিতের সাহায্যে এই পুজো করেন। এই বাড়িতে অন্নভোগ হয় না। ঠাকুরকে নৈবেদ্য দেওয়া হয়। দেবীর সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চদেবতা নবগ্রহ এবং ৬৪ দেবদেবীকে পুজো দেওয়া হয়। আগে এই বাড়ির ভোগ ছিল দেখার মতো। ঠাকুরকে বিরাট আকার আয়তনের শিঙারা, নিমকি লেডিকেনি-সহ ৬ রকমের নোনতা মিষ্টি দেওয়া হত। সেই জিনিসই প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হত দর্শনার্থী এবং নিমন্ত্রিতদের মধ্যে। এখন ঠাকুরের ভোগের জন্যই শুধু এত বড় মিষ্টি তৈরি হয়। কিন্তু অতিথি আপ্যায়নে যেন কোনও ত্রুটি না থাকে তার জন্য অষ্টমীর দিন বাড়িতে মহাভোজের আয়োজন করা হয়। দশমীতে ঘট বিসর্জনের পর দেবীকে অপরাজিতা রূপে পুজো করা হয়। সব বনেদি বাড়ির মতো এই বাড়িতেও আগে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হত। নীলকণ্ঠ নিষিদ্ধ হওয়ার পর পায়রার গলায় নীল রং করে ঠাকুর বিসর্জনের সময় ওড়ানো হত। এখন অবশ্য সে প্রথাও বন্ধ। একই ভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে জোড়া নৌকায় ঠাকুর বিসর্জন। এই বাড়িতে ঠাকুরকে দুই নৌকার মাঝে দোলনার মতো করে ঝুলিয়ে দেওয়া হত। মাঝগঙ্গায় গিয়ে দোলনার দড়ি আলগা করে ঠাকুরকে বিসর্জন দেওয়া হত।

আরও পড়ুন: ষষ্ঠীর দিন আমিষ খেতেই হয় বাড়ির মেয়েদের

ছাতুবাবু লাটুবাবুর বাড়ির পুজোর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে পণ্ডিতবিদায়। দুর্গাপুজোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও মনে করা হত, বছরের সব থেকে শুভ উৎসব ব্রাহ্মণ এবং পণ্ডিতদের দান করে শুরু করা উচিত। পুজো শুরুর সময় থেকে আজ পর্যন্ত সেই জন্য বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিন শহরের ব্রাহ্মণ এবং পণ্ডিতদের বিশেষ দান করা হয়। সন্ধিপুজোর সময় যখন দেবী অসুরকে নাশ করেন বলে মনে করা হয়, ঠিক সেই সময় ১০৮টি কারুকার্য করা রূপোর প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া হয় দেবীর সামনে। প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মাতৃমুখ। ধুপধুনো, নৈবেদ্য, পুজোর গন্ধ আর আলোকিত ঠাকুরদালান এক লহমায় ফিরে যায় সেই পুরনো সময়ে যখন ঠাকুরদালান ভরে থাকত আত্মীয়-অভ্যাগতে। নাক পর্যন্ত ঘোমটা দিয়ে মহিলামহল তদারকি করতেন বাড়ির গিন্নিরা। জুড়িগাড়ি আর পালকি ভিড় করে থাকত বাড়ির সামনে। সোজা কথা তো নয়, ছাতুবাবু লাটুবাবুর বাড়িতে পুজো হচ্ছে, সারা কলকাতার নিমন্ত্রণ আজ এই বাড়িতে...!

ছবি সৌজন্য: প্লাবন দাস

Community guidelines
Community guidelines