দক্ষিণের জানলা যেন একমুঠো খোলা হাওয়া

সুদীপ ভট্টাচার্য 

২১ অক্টোবর, ২০২০, ১৪:৩৮
শেষ আপডেট: ২১ অক্টোবর, ২০২০, ১৪:৪৯

রবীন্দ্রনাথ জানলাকে মুক্ত মনের আদিগন্ত পৃথিবী ভেবেছেন।


বাঙালির কাছে দক্ষিণের জানলা এক অমোধ টান। জানি না এ টান, এ ভালবাসা দক্ষিণের জানলাকে ঘিরে আর কারও আছে কি না। তবে জানলা নিয়ে যে প্রত্যেক বাঙালি অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ, সে কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
আমাদের এখানে জানলার ভাবনা অন্য রকম ছিল। বিশাল এক বাড়িতে বড় গরাদ-যুক্ত জানালা, তাতে লম্বা লম্বা শিক বা রড ফাঁক ফাঁক করে গাঁথা থাকত। বাদামি কাঠের জানালায় রং করা থাকত বেশ কড়া। যাতে ঝড়, বৃষ্টি আর রোদে তার ক্ষতি হতে না পারে।
তবে এটা ঠিক যে জানলার সঙ্গে যে একাগ্রতা, ঘর আর বাইরের মাঝখানের যে সূক্ষ্ম বন্ধন, সেটা আগে ছিল না তেমন করে।
পরবর্তী সময়ে, মূলত ইউরোপীয়দের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বাঙালি বাড়ির আর্কিটেকচার বদলে যেতে থাকে। জানলাও কিছুটা সাবলীল হতে শুরু করে। আরও একটা বিষয় আছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে অনেক দিন পর্যন্ত বাণিজ্যনগরী কলকাতায় বাড়ির জঙ্গল গড়ে ওঠে। ছোট গলি, তার দু’ধারে বাড়ি। এক বাড়ি থেকে আর এক বাড়ির দূরত্ব মাত্র কয়েক ফুট। জানালা খুললে হয় অন্য বাড়ির বসার ঘর, কিংবা শোওয়ার। তাই বেশির ভাগ সময়ে জানলা বন্ধ করেই রাখা থাকত।

সে বন্ধ থাকুক, কিংবা খোলা, যে জানলা একটা সময়ে আড়ালে গুরুত্বহীন হয়ে ছিল, সেখানেই যেন বিপ্লব এল রবীন্দ্রনাথের সময়ে। রবীন্দ্রনাথ জানলাকে মুক্ত মনের আদিগন্ত পৃথিবী ভেবেছেন। ঘরের আর বাইরের প্রকৃতির মধ্যে যে ভীষণ পার্থক্য, সেটাকে বার বার লঙ্ঘন করার চেষ্টা করে জানলাকে গ্রিল দিয়ে আটকে না রেখে মুক্ত রেখেছেন।
সময় বদলে গিয়েছে অনেকটা। এখন জানলা অনেক বেশি খোলামেলা। ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর ভাবনা অনেক দিন হল বেশ জনপ্রিয়। বড় বড় প্রোজেক্টের ফ্ল্যাটে গরাদ-বিহীন জানালা। স্লাইডিং উইন্ডো আর তার বড় বড় কাচ প্রকৃতিকে আরও বেশি করে নিয়ে এসেছে ঘরের মধ্যে। প্রায় আট ফুট বাই আট ফুট বিশাল জানলা এখন অনেক বাংলো বা বড় ফ্ল্যাটেই তৈরি করা হচ্ছে। জানালার প্লিন্থ হাইট খুব কম- মেঝে থেকে সামান্য ৮-১০ ইঞ্চি উঁচুতেই জানলা শুরু হয়ে যায়।
প্রায় একটা গোটা দেওয়াল জুড়ে জানলা। আর অনেকটা মুক্ত আকাশ।