ট্রেনে বেড়াতে যাচ্ছেন? জেনে নিন কিছু জরুরি তথ্য

সমীর গোস্বামী

১১ অক্টোবর, ২০১৮, ২১:০০
শেষ আপডেট: ১২ অক্টোবর, ২০১৮, ১৩:১৩

যাত্রার আগে টিকিট হারিয়ে গেলে অথবা ছিঁড়ে গেলে কী করবেন জানেন?


পুজো মানে দুর্গাপুজো। ছোট্ট শব্দটায় কী জাদু আছে কে জানে, যেখানে যত বাঙালি আছেন, সারা বছর তাকিয়ে থাকেন এই চারটি দিনের দিকে। আগে থেকে বিস্তর পরিকল্পনা। আর এসে গেলে তো কথাই নেই। পুরোমাত্রায় ‘চার্জড’ হয়ে যান। মেতে ওঠার কোনও সীমা থাকে না।

পুজোয় আনন্দলাভের যে উপকরণগুলি আছে, বেড়াতে যাওয়া তার অন্যতম। পুজোর ছুটিতে বেড়াতে যাওয়া কয়েক ধরনের মানুষ দেখা যায়। অনেকে আছেন মহালয়ার পরে দু’-এক দিন পুজো দেখে মাঝখানে বেরিয়ে পড়েন। বাকিরা পুজো শেষ করে বেড়াতে যান।

যে যখনই যান, একটা ক্ষেত্রে বেশির ভাগ মানুষের মিল— সেটা হচ্ছে ট্রেন ভ্রমণ। সেটাও কম আনন্দের নয়। ট্রেন ভ্রমণের আনন্দ নিশ্চিত করতে বা বলা ভাল পুরো ভ্রমণটাই সর্বাঙ্গসুন্দর করতে বেড়াতে যাওয়ার ঠিক প্রাক্কালে রেলের কিছু নিয়ম সম্পর্কে পরামর্শ বোধহয় দেওয়া যেতে পারে:

  • যাত্রার আগে টিকিট হারিয়ে গেলে অথবা ছিঁড়ে গেলে, নিয়ম হচ্ছে সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত রিপোর্ট জমা করা। তার পর রিজার্ভেশন অফিসারকে থানার রিপোর্টের ফটো কপি সমেত লিখিত আবেদন করতে হবে। টিকিটের তথ্যাদি অনুসন্ধানের পর মূল টিকিটের মূল্যের কিছু শতাংশ (বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ‘রেট’ ধার্য হয়) আবার দিলে ডুপ্লিকেট টিকিট ইস্যু করা হয়।
  • যদিও সবাই জানেন, তবুও এক বার স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, যথাসম্ভব কম মালপত্র এবং কিছুটা সময় হাতে নিয়ে স্টেশনে পৌঁছনো ভাল।
  • সুখবর হচ্ছে, এখন অনেক বড় স্টেশনেই এসক্যালেটর, র‌্যাম্প, এমনকি লিফটও রয়েছে।
  • স্টেশনে কুলি নিতে হলে লাল উর্দি পরা কুলি নেওয়াই ভাল। বড় স্টেশনগুলিতে এঁদের রেট ৪০ কিলোগ্রাম মালের জন্য ৫০ টাকা। তবে এঁরা পুজোর সময় এই রেট মানবেন কি না সন্দেহ। সে ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা দরদাম করতে হবে।

আরও পড়ুন: অসুখের ভ্রূকুটিতে পুজোর আনন্দে কাটছাঁট? রইল দরকারি সমাধান​

  • ‘লাল কুলি’ যেহেতু রেলের ‘লাইসেন্সড পোর্টার’, এঁদের প্রত্যেকের একটি করে নম্বর থাকে। নম্বরের উল্লেখ-সহ পেতলের একটি ব্যাজ এদের হাতে লাগিয়ে রাখার কথা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লাল উর্দিটা ঘাড়ে ফেলে রেখে অন্য জামা পরে থাকেন এবং ব্যাজ লাগান না। দু’টোর জন্যই, অর্থাৎ লাল জামা পরা এবং ব্যাজ লাগানোর জন্য জোর করা যেতে পারে। তবেই আপনি নম্বরটা দেখতে পাবেন।
  • খুব বেশি মাল হলে কুলিকে ট্রলি নিয়ে আসার জন্য বলা যেতে পারে। তার জন্য অত্যন্ত বেশি ভাড়া চাইলে স্টেশন ম্যানেজার বা স্টেশনমাস্টার অথবা বড় স্টেশনের ক্ষেত্রে ডেপুটি স্টেশন ম্যানেজার (কমার্শিয়াল)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
  • প্রবীণ নাগরিক বা শারীরিক অক্ষমতা থাকলে বড় স্টেশনে ব্যাটারিচালিত গাড়ি পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে ডেপুটি স্টেশন ম্যানেজার (কমার্শিয়াল)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। সেই গাড়িতে করে অনায়াসে ট্রেনের কামরা পর্যন্ত যাওয়া যায়। এ ছাড়া স্টেশনগুলিতে হুইলচেয়ার এবং স্ট্রেচারও থাকে। এর জন্যও স্টেশনে কর্মরত রেলকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
  • প্রতি যাত্রী স্লিপার ক্লাসে এবং এসি থ্রি টিয়ারে সর্বাধিক ৪০ কেজি, এসি টু টিয়ারে ৫০ কেজি এবং এসি ফার্স্ট ক্লাসে ৭০ কেজি মাল বিনামূল্যে নিয়ে যেতে পারেন। সামান্য বেশি হলে ক্লাস অনুযায়ী কিছু ছাড় দেওয়া হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে বড়দের অর্ধেক ওজনের মাল নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এর বেশি হলে সবাইকেই নির্দিষ্ট হারে মূল্য দিয়ে ‘বুক’ করতে হবে।

আরও পড়ুন: পুজোয় কী অসুখে কোন হোমিওপ্যাথি ওষুধ কাজে আসবে, জানেন?​

  • তৎকাল টিকিট যাত্রার এক দিন আগে বুক করা যায়। এসি ক্লাসের বুকিং শুরু হয় সকাল ১০টা থেকে এবং নন এসি ক্লাসের জন্য সকাল ১১টা থেকে। যাত্রার আগে ফাইনাল চার্ট না হওয়া পর্যন্ত তৎকালে টিকিট কাটা যায়। ক্লাস অনুযায়ী ন্যূনতম ১০০ থেকে সর্বাধিক ৫০০ টাকা বাড়তি ভাড়া দিতে হয়।

রেলের ৩টি হেল্পলাইন রয়েছে—

যে কোনও অনুসন্ধানের জন্য ১৩৮

রিজার্ভেশন ও ট্রেন চলাচলের জন্য ১৩৯

আরপিএফের সহায়তা দরকার হলে ১৮২

একই পরিবারের সদস্য, যেমন মা-বাবা, ভাই-বোন, পুত্র-কন্যা, স্বামী-স্ত্রী হলে কমপক্ষে যাত্রার ২৪ ঘণ্টা আগে প্রমাণ-সহ লিখিত আবেদন করলে, যে ব্যক্তির নামে টিকিট কাটা আছে, তাঁর বদলে পরিবারের অন্য কেউ যাত্রা করতে পারেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সবটাই নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট রেল অফিসারের সিদ্ধান্তের উপর।

আরও চারটি ক্ষেত্রে, যেমন সরকারি চাকরি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়া, এনসিসি-র সদস্য বা বিয়ে উপলক্ষে অনেকে মিলে যাওয়ার ক্ষেত্রেও একই ভাবে যাত্রী পরিবর্তন সম্ভব।

যে স্টেশনের টিকিট কাটা আছে তার পরেও যাত্রা বর্ধিত করতে হলে টিকিট পরীক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাত্রার দূরত্ব বর্ধিত করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে বাড়তি যাত্রাপথের টিকিট কাটতে হবে।

৪৯৭টি বড় স্টেশনে রেলের রিটায়ারিং রুম (এসি বা নন এসি) ও ডর্মিটরি স্টেশন অনুযায়ী নির্দিষ্ট মূল্যে ভাড়া পাওয়া যায়। তবে দু’দিনের বেশি বুকিং হয় না। আইআরসিটিসি-র ওয়েবসাইট বা গন্তব্য স্টেশনে গিয়ে টিকিটধারী যাত্রীরা বুক করতে পারেন।

বড় স্টেশনে ‘ক্লোক রুম’ও থাকে। এখানে জিনিসপত্র রেখে ঘুরে আসতে পারেন। তবে অবশ্যই জিনিসপত্রে তালা লাগাতে হবে। এর জন্য মাল পিছু প্রথম ২৪ ঘণ্টার জন্য ১৫ টাকা হারে এবং পরবর্তী প্রতি ঘণ্টা বা সর্বাধিক ২৪ ঘণ্টার জন্য ২০ টাকা হারে মূল্য দিতে হবে।

ট্রেনে পোষ্য নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। যদি এসি ফার্স্ট ক্লাস বা পুরনো ফার্স্ট ক্লাস কামরায় ২ বা ৪ বার্থ কেবিন বুক করা থাকে তা হলে সঙ্গে নিতে পারেন প্রিয় পোষ্যকে। অথবা খাঁচার মতো বাক্সে (ডগ বক্স) বন্ধ করে ট্রেনের গার্ডের কামরায় নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। দুই ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট হারে অগ্রিম বুকিং করতে হয়। ন্যূনতম মূল্য ৩০ টাকা। বড় স্টেশনে যেখানে বেশি ক্ষণ ট্রেন থামবে সেখানে পোষ্যকে খাইয়ে দেওয়া যায়।

আনন্দে সবাই বেড়াতে যাবেন। সঙ্গে অসুস্থ কেউ থাকলে অহেতুক ভয়ের কোনও কারণই নেই। তবু শুধুমাত্র জেনে রাখা ভাল বলে বলা যেতে পারে, ট্রেনের গার্ডের কাছে প্রয়োজনে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ‘ফার্স্ট এড বক্স’ থাকে। গার্ডদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। গুরুতর কিছু হলে টিকিট পরীক্ষক বা রাজধানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনে যেখানে ট্রেন সুপারিন্টেন্ডেন্ট আছেন, তাঁদের সঙ্গে তৎক্ষণাৎ যোগাযোগ করা উচিত। ওঁরা খবর পাঠিয়ে পরবর্তী স্টেশনে ডাক্তার আনার ব্যবস্থা করেন। এমনকি, দরকার হলে রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। আর চিন্তার কোনও কারণ নেই। এখন শুধু বেরিয়ে পড়ার পালা!

(লেখক রেলের অবসরপ্রাপ্ত মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক)

Community guidelines
Community guidelines