শরীর-মনের পলিশে নিউ নর্মাল নতুন পুজো

সাবেরী গঙ্গোপাধ্যায়

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১৮:৩৮
শেষ আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১৬:২৩

ত্বকচর্চার নতুন হুজুগ এখন বডি পলিশিং।


কখনও টেনশন। কখনও চড়া রোদে পোড়া। ফল— ঝলসানো ত্বক।

মন আর ত্বকের জেল্লা ফেরাতে রূপটানের নতুন হুজুগ এ বার বডি পলিশ। স্বচ্ছল উচ্চবিত্ত থেকে খাঁটি মধ্যবিত্ত। সেলেবদের ঝাঁ-চকচক শরীরের মতো শরীর পেতে দেদার খরচ করতে রাজি তাঁরাও।

গৃহবধূ অনন্যার কথাই ধরা যাক, তিনি আপ্লুত হয়ে বললেন, “এক ধরনের ম্যাজিক আছে এই বডি পলিশিংয়ে। আমার ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গিয়েছে। যে যার জগৎ নিয়ে ব্যস্ত। এক বান্ধবীর আবদারে প্রথম পার্লারে গিয়ে বডি পলিশিং করাই। সে দিন খুব আরাম পেয়েছিলাম। এই কোভিডের পর থেকে মনখারাপ কাটিয়ে দিয়েছে এই বডি পলিশিং। এখন যখনই খুব একা লাগে, মন ভাল লাগে না, পার্লারে বডি পলিশ করাতে যাই। সঙ্গে সঙ্গে মনখারাপ ভুলে নতুন আনন্দ পেয়ে যাই। নিয়ম মেনেই তো সব হচ্ছে, এটা ম্যাজিক ছাড়া আর কী?”
 
 
চাকরিজীবী স্টাইলিশ মহিলারা সকলেই এখন মেতেছেন বডি পলিশের নেশায়। পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে চেহারা নিয়েই কাজের জগতে তাঁরা ঘোরাফেরা করতে চান। পিছিয়ে নেই জেন ওয়াইয়ের দলও। “বাবার অফিস ট্যুরে বেড়াতে গিয়ে প্রথম বডি পলিশিং করাই। কেরলে একটা রিসর্টে অপশন ছিল বডি পলিশিংয়ের। পরে কলকাতায় এসে বাবাকে ম্যানেজ করে দেড় মাস অন্তর একটা পার্লারে গিয়ে বডি পলিশ করাই। পার্লার খোলার পরে সব নিয়ম মেনেই চলছে শরীর পালিশ। আসলে এখন তো কার্ভি লুকসের কদর। বডি পলিশিং মেদ কমাতেও সাহায্য করে,” যাদবপুরের ইংরেজির ছাত্রী কমলিকা বাবার খরচে বডি পলিশিং করালেও জানালেন, ওটা এখন ধার হিসেবেই তিনি নিচ্ছেন। চাকরি পেলে শোধ করে দেবেন।

ব্যাপারটা কী

শরীরের একে এক জায়গায় ত্বকের রং এক এক রকম— এই ধারণা এখন ব্যাকডেটেড। মেক আপ লাগিয়ে সব সময় রঙের ভারসাম্য আনা সম্ভব নয়। শরীরের সর্বত্র চাই এক রং। তাই ত্বকচর্চার নতুন হুজুগ এখন বডি পলিশিং। সোজা কথায় শরীর ঘষামাজা। বিশেষ করে লকডাউনের সময় থেকেই বাড়তে থাকা মানসিক চাপ, দূষণ, কাজের চাপ কেবল মনই নয়, শরীরকেও ম্লান করে। কোভিডের পর ক্লান্ত ত্বক, ছোপ-দাগওয়ালা পায়ের তলা, হাতের কনুই, ঘাড়ের কালচে ভাঁজ নিয়ে আর যাই হোক আত্মবিশ্বাসের আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। আর মন যদি ফুরফুরে না থাকে, তো সংসার থেকে অফিস থেকে আড্ডা, সবই যে মাটি।

 
ঘরের কিছু উপাদান দিয়ে স্নানের আগে বডি ম্যাসাজ ও স্ক্রাবিং করা যায়।
আজকের ওয়েট ম্যানিয়ার কথা মাথায় রেখে আর এক রূপচর্চা সংস্থার স্কিন অ্যান্ড স্পা বিভাগের দায়িত্বে থাকা সোনালি দে জানালেন, “বডি পলিশিং সব সময়ই প্রকৃতি থেকে পাওয়া জিনিসপত্র দিয়ে হয়। এতেও কিছু পরিমাণ ফ্যাট কমে। আমরা কোনও যন্ত্রের ব্যবহারও করি না।”
 

আসলে এখন মিডিয়ার যুগ, সিনেমা থেকে ছোট পর্দায় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের খোলামেলা পোশাক দেখে তা সকলেই পরতে চান। কিন্তু এই খোলামেলা পোশাকের জন্যে শরীরের যে অংশগুলো বেরিয়ে থাকে সেগুলো যাতে ঝলমলে দেখায় সেই জন্যই বডি পলিশিং আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। পিঠ খোলা চোলিতে পিঠটাই যদি অ্যাট্রাক্টিভ না হয় তবে পিঠ খোলা রেখে কী হবে? সোনালি আরও জানালেন, ‘‘নিজের ত্বক অনুসারে বডি পলিশিং পদ্ধতি নির্বাচন করা উচিত নয়তো শরীরে র‌্যাশ, অ্যালার্জির মতো নানা সমস্যা দেখা দেবে। যিনি বডি পলিশিং করছেন তাঁকে খুলে বলতে হবে ত্বকের প্রকৃতিটা ঠিক কেমন?”

কোন ত্বকে কেমন পলিশ

শুষ্ক ত্বক

এই ধরনের ত্বকের জন্যে খুব উপকারী ব্রাউন সুগার পলিশ, যা একসঙ্গে ময়শ্চারাইজিং এবং স্ক্রাবিংয়ের কাজ করে। আর চন্দন, গোলাপ গন্ধের অ্যারোমা অয়েল শরীরকে ঝরঝরে করে তোলে।

তৈলাক্ত ত্বক

এ ক্ষেত্রে স্ক্রাবিংয়ের জন্যে সি সল্ট ব্যবহার করতে হবে। সি সল্টের পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ক্লোরাইড শরীরের ভিতরকার মরা কোষ ঝরিয়ে শরীরের বয়স কমিয়ে লাবণ্য বাড়াবে। আর এ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত লেমন বা টি ট্রি অয়েল শরীরকে জীবাণুমুক্ত করবে।

সাধারণ ত্বক

কফির দানা, কলা, পেঁপে, আনারসের প্যাক দিয়ে, অর্থাৎ, নানা ফলের উপর নির্ভর করেই এই ধরনের ত্বকে বডি পলিশ করা হয়। “ত্বক পলিশের ক্ষেত্রে ফ্রুট অ্যাসিডের মতো উপকারী আর কিছু হতে পারে না,” জানালেন মৌসুমী। এর সঙ্গে অ্যাভোকাডো, গ্রেপ সিড অয়েল দিয়ে ম্যাসাজটা করা হয়।

বাড়িতে বডি পলিশ

মৌসুমী জানাচ্ছেন বডি পলিশিংয়ের খরচ তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। তবে প্রতি সপ্তাহে না করে তা মাসে এক বার করলেই চলবে। খরচ কমাতে চাইলে স্ক্রাবিং বা ম্যাসাজ ক্লিনিং, এ ভাবে আলাদা করেও করানো যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রতি ধাপের খরচ হাজার টাকা।
 
 
বডি পলিশিং করালে কিছু পরিমাণ ফ্যাট কমে।
খরচ আরও কমাতে চাইলে বাড়িতে নিয়মিত বডি পলিশিংয়ের রুটিন তৈরি করা যায়। যেমন করেন অভিনেত্রী তনুশ্রী চক্রবর্তী। “শুটিংয়ের চাপে পার্লারে নিয়মিত যাওয়া হয়ে ওঠে না আমার। তাই ঘরোয়া পদ্ধতির উপর আমি অনেক বেশি নির্ভর করি। তবে শুটিংয়ের ক্লান্তি কাটাতে, নিজেকে ঝরঝরে করতে বডি পলিশিং এখন আমার কাছে রুটিন জব,” জানালেন তনুশ্রী।

ওটমিল স্ক্রাব, দই, মধু, বেসন, চিনি গুঁড়ো, চাল গুঁড়ো— এই ধরনের সহজলভ্য উপাদান দিয়ে স্নানের আগে বডি ম্যাসাজ ও স্ক্রাবিং করা যায়।

তিন চামচ ওটমিল, তিন চামচ ব্রাউন সুগার আর তিন চামচ অলিভ অয়েল ফুটিয়ে নিয়ে মিশ্রণ হিসেবে তৈরি করে ম্যাসাজ করলেও তা খানিকটা বডি পলিশিংয়ের কাজ করে। কোনও কোনও স্যালোনে ব্রাইডাল প্যাকেজে বডি পলিশিং করানো হয়। “সেই জন্যই বিয়ের দিন ঠিক হওয়ার পরেই বডি পলিশিংয়ের বুকিং করিয়েছি আমি,” জানালেন সমর্পিতা। আগামী বছরের গোড়ায় ওঁর বিয়ে।
 
 
পাল্টে যাচ্ছে সময়। নিউ  নর্মাল-এ ভাল থাকার সংজ্ঞা। ভাল থাকা মানে যেমন একলা ঘরের বই, তেমনই ভাল থাকা মানে নিজের শরীরের সঙ্গে নিজের মনের খেলা। এই শরীর আর মনকে এক সঙ্গে জাগিয়ে তুলতেই বডি পলিশিংয়ের এত রমরমা। এখন নিজেকে পালিশ করা নতুন আলোয় চিনতে চাইছেন সব মেয়েই।