করোনাসুরকে হারাতে হবে, ‘ইমিউনিটি’ বাড়াতে কী কী খাবেন

সুমা বন্দ্যোপাধ্যায়

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১৩:৪০
শেষ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১৪:২২

ইমিউনিটি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ৭০–৭৫ শতাংশ আসে আমাদের রোজকার খাবার থেকে।


করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এ দিকে পুজোর বাদ্যিও বাজতে শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুজোয় যতটা কম বেরনো যায় ততই মঙ্গল। কিন্তু দুর্গাপুজোয় বাইরে না গেলে কি মন ভরে? উপায় আছে তো বটেই!
 
করোনা ঠেকানোর প্রথম এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় যথাযথ মাস্ক পরা আর মানুষে মানুষে দূরত্ব বজায় রাখা। আরও একটা উপায় আছে, এতে কোভিড-১৯ ছাড়াও অন্য অসুখকেও প্রতিরোধ করা যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্থাৎ ‘ইমিউনিটি’ বাড়লে অতিমারি সৃষ্টিকারী জীবাণুই হোক বা অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কম থাকে। ইমিউনিটি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ৭০–৭৫ শতাংশ আসে আমাদের রোজকার খাবার থেকে।
 
ডায়েটিশিয়ান সুবর্ণা রায়চৌধুরী জানালেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যে কার্যকর ভূমিকা নেয় ভিটামিন সি, ভিটামিন –ডি, ভিটামিন ই আর দুটি অত্যন্ত দরকারি মিনারেলস জিঙ্ক ও সেলেনিয়াম এবং উচ্চমানের প্রোটিন।
 
 
 
দুপুরের খাবারে ভাত বা রুটির সঙ্গে  ৩/৪ রকম সব্জি খেলে ভাল হয়।
 
সুবর্ণার কথায়, “খাবার খেয়ে রাতারাতি ইমিউনিটি বাড়ানো যায় না। সুষম ডায়েটের সঙ্গে নিয়ম করে শরীরচর্চা করা দরকার।’’ এক মাস পরই পুজো, তার মধ্যে রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে হলে এখন থেকেই সঠিক  খাবার নির্বাচন করার পরামর্শ দিলেন তিনি। সকালের জলখাবার থেকে রাতের খাবার মোট ৫–৬ বার ছোট ছোট মিল ভাগ করে খাবার খাওয়া উচিত। সুষম খাবার মানে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিনস, মিনারেলস ও ট্রেস এলিমেন্টের সমন্বয়, বললেন সুবর্ণা রায়চৌধুরী।
 
সকালের জলখাবারে অনেকেই কর্নফ্লেক্স খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু কর্নফ্লেক্সের থেকে হাতে তৈরি রুটি, চিড়ে, খই বা ওটস খাওয়া ভাল। সঙ্গে একটা ডিম আর একটা গোটা ফল খাওয়া যেতে পারে। কলায় ফ্রুক্টো-অ্যালিগোস্যাকারাইড জাতীয় প্রি-বায়োটিক থাকে যা স্বাদে মিষ্টি হলেও শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি অন্ত্রে থাকা ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে হজম শক্তি বাড়ায়। একই সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়ারিয়া প্রতিরোধ করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয়।
 
রোজ জলখাবারে বা দুপুরে একটা কলা খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। নিয়ম করে দুধ, বাড়িতে পাতা দই, ছানা খেতে পারলে ভাল। তবে ল্যাকটোজ অ্যালার্জি থাকলে সয়াবিনের দুধ বা টোফু খাওয়া উচিত। অনেকে ডিমের কুসুম বাদ দিয়ে খান, কিন্তু ডিমের কুসুমে থাকে ভিটামিন এ-সহ নানা খনিজ। অন্য শারীরিক সমস্যা না থাকলে গোটা ডিম খেতে কোনও বাধা নেই, জানালেন পুষ্টিবিদ।
 
সকালে জলখাবারের আগে খালি পেটে একটা গোটা পাতিলেবুর রস করে খেলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার হয়। পাতিলেবুতে থাকা ভিটামিন সি, লিমোনিন, সাইটোস্টেরল গ্লাইকোসাইডস, ফ্ল্যাভেনয়েডস সহ নানা ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস থাকে। এ গুলি বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। এখন বাজারে কাঁচা আমলকি পাওয়া যাচ্ছে। রোজ একটা আমলকিতে শরীরের ভিটামিন সি-র চাহিদা  মিটবে।
 
 
দুপুরে বা রাতে অল্প করে বাড়িতে পাতা দই বা সকালের জলখাবারের পর দইয়ের ঘোল খেলে ভাল হয়। দই দিয়ে রায়তা বানিয়েও খাওয়া যেতে পারে। দুপুরের খাবারে ভাত বা রুটির সঙ্গে ডাল, মাছ বা চিকেন আর ৩/৪ রকম সব্জি খেলে ভাল হয়। কুমড়ো, ঢ্যাঁড়শ, পটল, ঝিঙে, বাঁধাকপি সব সবজিতেই পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন, মিনারেলস ও ফাইবার আছে।
 
 
দুই থেকে তিন রকম ফল টুকরো করে কেটে দই ও মধু দিয়ে ফ্রুট স্যালাড বানিয়ে খাওয়া যেতে পারে।
 
সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন কলমি শাক, নটে শাক, লাউ বা কুমড়ো শাক খান। শাকের ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয়। প্রতিটি রান্নায় টোম্যাটো ব্যবহার করতে পারেন। টোম্যাটোর লাইকোপিন আমাদের সুস্থ থাকতে সাহায্য করে, বললেন সুবর্ণা। রান্না করলে শাক সব্জির উপকারিতা বা  ভিটামিন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়, এই ধারণা মোটেও ঠিক নয়।
 
নটে শাক, কলমি শাক, কুমড়ো, উচ্ছে, পটল, ঝিঙে, বরবটি এই সময়ে বাজারে যে সব সবজি পাওয়া যায় সবগুলিই কিন্তু আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জোরদার করতে পারে। বিভিন্ন ভিটামিনের মধ্যে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই সংক্রমণ ঠেকাতে কার্যকর। ভিটামিন ডি-র সব থেকে ভাল উৎস রোদ্দুর। তাই রোদ্দুর লাগান অন্তত ১৫–২০ মিনিট।
 
 
সুবর্ণার মত, ‘‘সব খাবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খাওয়া দরকার। তাতেই মিলবে পর্যাপ্ত পুষ্টি, যাতে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার হবে। বিকেলের জলখাবার হিসেবে অত্যন্ত ভাল কল বেরনো ছোলা বা গোটা মুগ, পিঁয়াজ, পাতিলেবু, লঙ্কা মিশিয়ে মেখে খাওয়া। বিকেলে রোল, চপ, কাটলেট খেলে চলবে না। চাইলে রুটির মধ্যে ডিম বা চিকেনের টুকরো দিয়ে রোল বানিয়ে খাওয়া যেতে পারে।’’
 
আদা-পিঁয়াজ-বাদাম কুচি দিয়ে বাড়িতে বানানো ঝাল মুড়ি বিকেলের জলখাবার হিসেবে অত্যন্ত পুষ্টিকর। কলা ছাড়া পেয়ারা, ন্যাসপাতি, পেঁপে, আপেলের মতো নানা রকম ফল খাওয়া উচিত। দুই থেকে তিন রকম ফল টুকরো করে কেটে দই ও মধু দিয়ে ফ্রুট স্যালাড বানিয়ে খাওয়া যেতে পারে, পরামর্শ সুবর্ণার।
 
ভাত, ডাল, শাক, সবজি, মাছ, ডিম, রুটি সব মিলিয়ে মিশিয়ে খেতে হবে। রাতের খাবার ৯টা থেকে ৯.৩০টার মধ্যে খেয়ে নিলে ভাল হয়। রাতে বেশি মশলাদার খাবার, পেট ভরে খাওয়া ঠিক নয়। পুষ্টিকর খাবার খেয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে কোভিড-১৯ রুখে দিন। তবে মাস্ক পরতে ভুলবেন না যেন।