দুর্গার সাবেক ঐতিহ্য আজও বেঁচে বর্ধমানে

নিজস্ব প্রতিবেদন

১৬ অক্টোবর, ২০১৮, ১৩:১৬
শেষ আপডেট: ১৬ অক্টোবর, ২০১৮, ১৩:১৫

জাঁকজমক না রাখতে পারলেও যথাসম্ভব প্রাচীন রীতিনীতি অক্ষুণ্ণ রেখে পুজো করে যাচ্ছেন কিছু মানুষ। লিখছেন ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী।


শরৎকালে সপরিবার উমা আসেন বাপের বাড়ি, সারা বছর তারই অপেক্ষা বাংলার ঘরে ঘরে। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে আসা স্বাভাবিক, আলাভোলা বরটিকেও তো রেখে আসা সম্ভব নয়। কিন্তু এর মধ্যে মহিষাসুর কেন? সেই সুদূর কৈলাস থেকে একটা মরা মোষ আর একটা আধমরা অসুরকে এতটা রাস্তা টেনে নিয়ে আসা তো কম ঝক্কির ব্যাপার নয়! জহর সরকার বিষয়টি নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছিলেন ‘সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’য়, এখানে তার পুনরাবৃত্তি অনাবশ্যক। আসলে প্রত্নতত্ত্ব আর পুরাণের সাক্ষ্যপ্রমাণ ঘাঁটতে বসলে বোঝা যায়, সুপ্রাচীন এক দেবীকল্পনাকে মধ্যযুগেই বাঙালি তার নিজস্ব দুর্গায় গড়ে নিয়েছিল। দক্ষিণবঙ্গের চন্দ্রকেতুগড়-তমলুকের খ্রিস্টপূর্ব যুগের যক্ষিণীমূর্তিতে প্রাক্‌-দুর্গার আভাস মেলে, কারণ তাদের কেশসজ্জায় গাঁথা রয়েছে দুর্গার পাঁচটি সুপরিচিত প্রহরণ— বাণ, পরশু, অঙ্কুশ, বজ্র ও ত্রিশূল। অন্য দিকে রাজস্থানের নাগোর-এ পাওয়া আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের এক ফলকে সম্ভবত রয়েছে মহিষমর্দিনী দেবীর প্রাচীনতম নিদর্শন। সেখানে কিন্তু সিংহ নেই, সিংহবাহিনী দেবীর উৎস ভারতের বাইরে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে খ্রিস্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতকে মধ্য ভারতে আলাদা আলাদা ভাবে সিংহবাহিনী ও মহিষমর্দিনী দেবীর পূজা প্রচলিত ছিল, এমন প্রমাণের অভাব নেই। এই দুইয়ের মিলিত রূপ দেখা যাবে সপ্তম শতকে, দক্ষিণ ভারতের মহাবলীপুরমে।

বাংলায় চতুর্থ-পঞ্চম শতক থেকেই মহিষমর্দিনী দুর্গার মূর্তি পাওয়া যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গ থেকে পাওয়া এমন টেরাকোটা ও পাথরের ভাস্কর্য নিদর্শন রক্ষিত আছে বর্তমান বাংলাদেশের মহাস্থান সংগ্রহশালায়। বাংলায় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত সিংহবাহিনী ও মহিষমর্দিনী দেবীর পৃথক ও মিলিত, দুই ধরনের মূর্তিরই পূজা প্রচলিত ছিল। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের নিরিখে শুধু সিংহবাহিনীর সংখ্যা কম। সিংহবাহিনী ও মহিষমর্দিনী দেবীর মূর্তির সঙ্গে শিব, গণেশ ও কার্তিককেও দ্বাদশ শতকের মূর্তিতে পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই পরিবারে লক্ষ্মী-সরস্বতীর প্রবেশ ঘটল কবে বা কোন পথে, তা বলা কঠিন। গৌতম সেনগুপ্তের মতে, ‘‘দেবীর ভক্তের কাছে লক্ষ্মী এবং সরস্বতী দুর্গার অমিতশক্তির প্রক্ষেপণ, সম্ভবত এই অভিন্নতা বোধ থেকেই প্রাচীন মহিষমর্দিনী সিংহবাহিনী প্রতিমাপার্শ্বস্থ সহচরীদ্বয় মধ্যযুগে রূপান্তরিত হয়েছেন লক্ষ্মী এবং সরস্বতী পরিচয়ে।’’

পাল-সেন যুগের প্রস্তর-ভাস্কর্যে অমিল হলেও মধ্যযুগের মন্দির টেরাকোটায় অনেক ক্ষেত্রেই সপরিবার দুর্গার দেখা মেলে। অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন মুর্শিদাবাদ জেলার গোকর্ণ গ্রামের নরসিংহ মন্দিরের (১৫৮০) টেরাকোটা ফলকে মহিষাসুরমর্দিনী— সেটি কিন্তু পুত্রকন্যাবিহীন চতুর্ভুজা মূর্তি। টেরাকোটায় একই ‘মেড়’ বা চালের মধ্যে সপরিবার দুর্গা রয়েছেন বর্ধমান শহরের সর্বমঙ্গলা মন্দিরে (১৯ শতকের প্রথম ভাগ)। এর সিংহ ঘোড়ার আকৃতি, দুর্গার দু’টি হাত বাকি আটটি হাতের তুলনায় বড়। আবার মন্দির টেরাকোটাতেই দেখা যায়, মেড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবী ও তাঁর পুত্রকন্যাদের সাজানো হয়েছে আলাদা ভাবে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, এক চালের বাইরে এনে মূর্তি সাজানো আধুনিক শিল্পীদের অবদান নয়, এর প্রচলন ছিল অনেক আগেই। বিষ্ণুপুরের শ্যামরায় মন্দিরে (১৬৪৩) যেমন পাচ্ছি এর প্রাচীন নিদর্শন, তেমনই বর্ধমান জেলার বাহাদুরপুর গ্রামের ১৮ শতকের রঘুনাথ মন্দিরেও রয়েছে এর নমুনা। পুরাণের মতে, দেবী দুর্গার অকালবোধন করেছিলেন স্বয়ং ব্রহ্মা। কৃত্তিবাসী রামায়ণের কাহিনিতে কিন্তু বোধন ও আরাধনা করেন রামচন্দ্র স্বয়ং। বাংলার মন্দিরে কৃত্তিবাসী রামায়ণের প্রভাব সুস্পষ্ট। তাই লঙ্কার রণক্ষেত্রে এই অকালবোধনের দৃশ্য মন্দির টেরাকোটায় দুর্লভ নয়। বর্ধমান জেলার কালনার প্রতাপেশ্বর মন্দিরে (১৮৪৯) মহিষমর্দিনী দেবীকে যুদ্ধরত রাম-রাবণের মধ্যে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায়। রামের দিকে সশস্ত্র বানরসেনা, অপর দিকে রাক্ষসবাহিনী। পুত্রকন্যারা এখানে অনুপস্থিত। কালনারই কৃষ্ণচন্দ্রের পঁচিশচূড়া মন্দিরে (১৭৫১) সপরিবার দুর্গা, সঙ্গে জয়া-বিজয়ার মূর্তি আছে।

আরও পড়ুন: প্লাস্টিক বর্জন করল এই পুজো কমিটিগুলি​

আরও পড়ুন: আমার দুর্গা...​

মন্দির টেরাকোটার মতোই বর্ধমানে দুর্গাপ্রতিমার আর একটি শিল্পধারাও গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হল পটের দুর্গা। দীপঙ্কর ঘোষ তাঁর বিস্তারিত ক্ষেত্রানুসন্ধানে বর্ধমান জেলায় পটে আঁকা দুর্গাপূজার বেশ কয়েকটি উদাহরণ খুঁজে পেয়েছেন। তার মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত ও সুপরিচিত ছিল অবশ্যই বর্ধমান শহরে বর্ধমান রাজপরিবারের পটেশ্বরী দুর্গা। রাজা তেজচন্দের সময় থেকেই এই পটদুর্গা পুজোর প্রচলন বলে জানা যায়। প্রণয়চন্দ মহতাব পরে নতুন করে পট আঁকিয়ে পুজো শুরু করেন। লক্ষ্মীনারায়ণজিউ মন্দিরে মৃত্যুঞ্জয় দে অঙ্কিত এই পটটি রক্ষিত আছে। বর্ধমান শহরের মিঠাপুকুরে ঘোষবাড়ির পটদুর্গা পুজোর সূচনা ১৮৮৯ সালে, কানাইলাল ঘোষের সময়। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই পুজো চলেছিল। গলসি থানার বাহিরঘন্না গ্রামে হাজরা পরিবারের তিনশো বছরের পটদুর্গা পুজো তিন দশক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পটদুর্গা পুজোর যে সব নজির দীপঙ্কর দেখতে পেয়েছিলেন তার মধ্যে ছিল বর্ধমান শহরের বোরহাট এলাকার দাসবাড়ির পুজো, মঙ্গলকোট থানার মাঝিখাড়া গ্রামের সাহাবাড়ির পুজো, আউশগ্রাম থানার গুসকরা-র পাত্রবাড়ির পুজো, ওই থানারই ভেদিয়ার চক্রবর্তীবাড়ির পুজো, খণ্ডঘোষ-রায়পাড়ার সেনগুপ্তবাড়ির পুজো, খণ্ডঘোষ ভট্টাচার্যপাড়ার চট্টোপাধ্যায়বাড়ির পুজো ইত্যাদি। বাংলার এই ব্যতিক্রমী শিল্পরূপ ক্ষীণতোয়া হয়ে এলেও টিকে আছে জেলার নানা প্রান্তে।

বর্ধমানের সব থেকে বিশিষ্ট দুর্গাপুজো বোধহয় শহরে কীর্তিচন্দ (১৭০২-৪০) প্রতিষ্ঠিত ‘সর্বমঙ্গলা’ মন্দিরের পুজো। মূর্তি প্রাচীন, অষ্টাদশভুজা সিংহবাহিনী। ১৮২০ সালে প্রতিষ্ঠিত রাধাবল্লভবাড়ির সপরিবার শ্বেতপাথরের দুর্গার পুজোও দেখার মতো। মঙ্গলকোট থানার ক্ষীরগ্রামের প্রাচীন ‘যোগাদ্যা’ দুর্গার পুজোও উল্লেখযোগ্য, যদিও সে পুজো হয় বৈশাখ-সংক্রান্তিতে, সারা বছর মহিষমর্দিনী মূর্তি থাকে জলতলে। বর্ধমান জেলার সর্বত্রই বহু দুশো-আড়াইশো বছরের পারিবারিক পুজো এখনও অনুষ্ঠিত হয়, তবে অনেক প্রাচীন পুজো আস্তে আস্তে লোকাভাব, অর্থাভাব, শরিকি বিবাদ ইত্যাদি কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যাঁরা পুজো বজায় রেখেছেন, তাঁরা এক কালের জাঁকজমক না রাখতে পারলেও যথাসম্ভব প্রাচীন রীতিনীতি অক্ষুণ্ণ রেখে পুজো করে যাচ্ছেন। এমন সব বিখ্যাত পারিবারিক পুজোর মধ্যে আছে কাটোয়া মহকুমার কেতুগ্রাম থানার গঙ্গাটিকুরি গ্রামে ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুজো, যা শুরু হয়েছিল ১৮৮৫ সালে। মানকরে বিশ্বাসবাড়ির পুজো তিনশো পেরিয়েছে বলে কথিত। মানকরেই আছে বর্ধমান রাজের কবিরাজ ও গুরুদেবের বাড়ির পুজো। সদর থানার বড়শুল গ্রামের জমিদার দে পরিবারের পূজিতা মূর্তি হরগৌরী, আউশগ্রাম থানার দেবশালা গ্রামের বক্সি বাড়ির মুণ্ডপূজা— প্রতিমায় মা-দুর্গার কেবল মুখাবয়ব গড়া হয়। আমাদপুর গ্রামের রামকান্ত চৌধুরীর পুজোর সূচনা ১৭৯৭ সালে। এই পরিবারের পুজোয় শিবনাথ শাস্ত্রী, কালীপ্রসন্ন সিংহ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ মনীষী এসেছেন বলে শোনা যায়। চকদিঘির সিংহরায় পরিবারের পুজোও তিনশো বছর আগে শুরু হয়েছিল। কালনার সেনবাড়ির পুজোও দুশো বছরের পুরনো। এমন সব পুজোর মধ্যে বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারা আজও বহমান।

Community guidelines
Community guidelines