বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির তপ্তকাঞ্চনবর্ণা দুর্গা

হিমি মিত্র রায়

০২ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:৩৫
শেষ আপডেট: ০২ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:৪৬

জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির পুজোয় দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, কলাবউ ছাড়াও এই তিন দেবীও পুজিত হন।


বড় বাজেটের পুজোয় নানা আকর্ষণ। মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জায় প্রতি বছর নিত্যনতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এক থিমপুজোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা অন্য থিমপুজোর। দর্শনার্থীর ঢল নামে মণ্ডপে মণ্ডপে। এর বাইরে দাঁড়িয়েও হাতছানি দেয় প্রাচীন কিছু পুজো, সাবেকিয়ানার ঐতিহ্য বহন করে যারা। যেমন, জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গোৎসব।
 
জলপাইগুড়ি রাজবাড়ির দুর্গাপুজো উত্তরবঙ্গের দুর্গাপুজোগুলির মধ্যে সাবেকিয়ানায় অন্যতম। থিমের ছড়াছড়ি এখন সর্বত্র। বিগ বাজেটের পুজোয় থাকে নিত্যনতুন চমক। কোথাও তৈরি হচ্ছে সোনার জলে মোরা বিরাট আকার  প্রতিমা, কোথাও রুপোর পাতের কাজ, কোথাও বালি তামা, কাচ— কত রকমের উপকরণ। পাল্লা দিয়ে থাকে আলোর মেলা। কোথাও ভুতুড়ে-অলৌকিক আবহ, তো কোথাও তাজমহল। এ সবের মধ্যে কি চাপা পড়ে গিয়েছে সাবেকিয়ানা? পাঁচশো নয় বছরের পুজোর আমেজ ফিকে হয়ে গিয়েছে? উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম।
 
এই মাতৃকা দেবীকে অন্ধক নামের অসুরের রক্ত পান করার জন্য সৃষ্টি করা হয়। সরস্বতী, বিদ্যা। যাঁর প্রভাবে জয়ী হওয়া যায়, ইনিই সেই দেবী। ইনি চৌষট্টি যোগিনীর একজন এবং গৌতম অহল্যার কন্যা। তবে কালিকাপূরাণে একে সতীকন্যা রূপে উল্লেখ করা আছে। ইনি বিজয় প্রদান করেন। শ্রী সম্পদ দ্বারা জয় লক্ষ্মী লাভ করা সম্ভব। যে দেবীদের কথা বলা হল, তাঁরা জয়া ও বিজয়া। আসলে, সরস্বতী ও লক্ষ্মী। আরও একজন দেবীর কথা বলা দরকার। মেছেনি। শব্দটি মেচেনি বা মেচপত্নী থেকে এসেছে। আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যে মেচ জনগোষ্ঠীর মানুষজন রয়েছেন, তাঁদের একটা অংশ মেচি নদীর ধারে বাস করে। আবার কিছু অংশ থাকে অসম-ভুটানের পার্বত্য অঞ্চলে।
 
জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির পুজোয় দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, কলাবউ ছাড়াও এই তিন দেবীও পুজিত হন। মাছ কাটতে দেখা যায় মেছেনি মূর্তিকে। থাকেন মহাদেব আর ব্রহ্মাও।
 
বৈকুণ্ঠপুরের অধিদেবতা বৈকুণ্ঠনাথ বা বিষ্ণু।  লোককথায় বৈকুণ্ঠপুরের প্রথম মহারাজার জন্মদাতা মহাদেব। বৈকুণ্ঠপুরকে স্বর্গের মতো গড়ে তুলতে হলে মহাবিশ্বকর্মা  ব্রহ্মার প্রয়োজন। এই রাজ্যে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের স্থান সর্বপ্রথমে। অন্যান্য পুজোয় দেবীর চালচিত্রে মহাদেবের ছবি আঁকা থাকলেও রাজবাড়ীর দুর্গাপূজায় ব্রহ্মা এবং মহাদেব এই দুই দেবতাই থাকেন মৃন্ময় রূপে। দেবীর সামনে আলাদা আসনে ধাতুর বৈকুণ্ঠনাথ অধিষ্ঠিত। ঘটের সামনে ছোট সোনার দুর্গাপ্রতিমা।
 
ভিড়ের চাপে এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপ ঘুরে পুজো দেখার মধ্যে আনন্দ অবশ্যই আছে। কিন্তু সাবেকি পুজোর আকর্ষণ আলাদা! বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির পুজোর পরতে পরতে রয়েছে ইতিহাসের নানা কাহিনি। এ দুর্গাপুজোর শুরু ৫০০ বছরেরও আগে। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, কলাবউ রহস্য। অনেকেই কলাবউকে গণেশের স্ত্রী বলে ভুল করেন। কিন্তু তাঁরা স্বামী-স্ত্রী নন। কলাবউয়ের আরেক নাম নবপত্রিকা। ন’়টি গাছকে এক সঙ্গে বেঁধে অপরাজিতা লতা ও হলুদ সুতির কাপড় জড়িয়ে কপালে সিঁদুর দিয়ে কলাবউ রচনা করা হয়। বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির পুজোয় সপ্তমীর দিন কলাবউকে ধুমধামের সঙ্গে স্থাপন করতেন রাজা স্বয়ং। এখন রাজবংশের কেউ তা স্থাপন করেন।
 
রাজবাড়ি দিঘিকে ডান হাতে রেখে সামনে এগিয়ে গেলে রায়কতদের রাজবাড়ি। ডান দিকে ঠাকুরদালান। সেখানে পুজিত হন দেবী দুর্গা। দেবীর গায়ের রং এখানে তপ্তকাঞ্চন বর্ণ। এই রং আসলে কেমন তার ঠিকঠাক ধারণা ছিল না স্থানীয় কারিগরদের। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের মৃত্যুর পর থেকে তা ক্রমশ লাল রঙে পরিবর্তিত হতে থাকে। কিন্তু নানা তথ্যা আবিষ্কারের পর ২০০২ সালে সোনা গলিয়ে টেম্পল স্ট্রিটের লক্ষণ কর্মকার তপ্ত কাঞ্চনবর্ণের প্রমাণ দেখান। সেই বছর থেকে দেবী আবারও তপ্ত কাঞ্চনবর্ণা।
 
বিশালাকার দেবীমূর্তি। রং ঠিকরে বেরোচ্ছে। সে রং দেবীর চোখে-মুখে এক আশ্চর্য আভা তৈরি করেছে, যা দেখে শিহরন জাগে! মনে হয়, এ মূর্তি সাহস জুুগিয়ে চলেছে সাধারণ মেয়েদের, যাঁরা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলেছেন! কোথাও সংসারের সঙ্গে, কোথাও সমাজের সঙ্গে! প্রতি বছর এই পুজোয় না গেলে মনে হয়, পুজো দেখা হল না! রাত একটা বা দু’টোয়, যখন মোটামুটি ফাঁকা হয়ে যায় মণ্ডপ, তখন ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে শুনতে,  জোনাকির চিকচিকের মধ্যে মহামায়াকে দু’চোখ ভরে দেখার অনুভূতিই আলাদা!
 
দেবী আলাদা সব ক্ষেত্রে। ব্যাঘ্রবাহনা এবং সিংহবাহনাও। বনদুর্গা ছাড়া তাদের বাহন হিসেবে দেখা যায় না আর কোথাও। দেবী দুর্গার আরেক নাম বনদুর্গা। বনবিবি রূপে পূজিত হন তিনি সুন্দরবন অঞ্চলে,  যেখানে বাঘের মানুষের সংঘাত চলে। কিন্তু উত্তরবঙ্গে ইনি ভাণ্ডানি নামে  পুজিতা। কেউ কেউ মনে করেন, ভাণ্ডানি ও দুর্গা একই। জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের  মানুষের মধ্যে বাঘের ভয়ই সুন্দরবনের মতো এখানেও দেবীর ব্যাঘ্রবাহনা হওয়ার মূল কারণ ছিল।
 
রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় মেলার চল ছিল। মূলত দুর্গা ও মনসা পূজার মেলা হত। দূরদূরান্ত থেকে প্রচুর মানুষের সমাগম হত, নাচগানে ভরে উঠত মেলাপ্রাঙ্গণ। এখন সেটা শুধুই মনসা পুজোয় হয়ে থাকে। মেলার জাঁকজমক আগের চেয়ে বেশ কমেছে বলেই মনে হয়। ইতিহাসে আরও একটি বিষয় পাওয়া যায়। তা হল হাতি চুমানি । দুর্গাপূজার ধুমধামের সঙ্গে এই রীতি পালন করা হত। রাজহস্তীগুলিকে আকর্ষণীয় ভাবে সাজানো হত, বরণডালা সহযোগে বরণ করা হত তাদের। তারপর ধূপধুনো দিয়ে নৈবেদ্য সাজিয়ে, প্রদীপ জ্বালিয়ে নিয়ে যাওয়া হত। বৈকুণ্ঠপুরের রাজা একাদশীর দিন সব চেয়ে ভাল হাতিতে চড়ে শিকারে  যেতেন। এই সময়ে বিস্তর খাওয়াদাওয়ার চল ছিল। প্রজারা গরুর গাড়ি করে পুজোয় অংশগ্রহণ করতে আসতেন। প্রতিদিনই মহাভোজ। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পুজোর জিনিস রাজভাণ্ডারে জমা হত। এখন সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী এই চারদিনে ভোগ অর্পণ করা হয় দেবীকে। কোনওদিন পান্তাভাত, কচুর শাক বা ইলিশ মাছ ,আবার কোনওদিন বোয়াল মাছের বিভিন্ন পদ।
 
হিন্দু মতে হয়ে চলা এই পুজোয় মুসলিম প্রজারাও সমান ভাবে অংশ নিতেন। তখন ফতোয়া দানকারী কোনও লোক ছিল না। ধর্ম নিয়ে বিভেদ ছিল না। সম্প্রীতির সেই ইতিহাসই বহন করে চলেছে এই পুজো।

মহা ধুমধামের সঙ্গে দেবীকে বিদায় জানানোর রীতি রয়েছে। বিশালাকার  দেবীপ্রতিমা-সহ বাকি প্রতিমাকে ঠাকুরদালান থেকে বার করে দড়ি দিয়ে টেনে এনে ওই সামান্য পথ অতিক্রম করে পুকুর পর্যন্ত নিয়ে আসতে অনেকটা সময় লাগে। বাজি, পটকা, লোকের ভিড়, ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা— সব কিছু মিলিয়ে এই উৎসব অন্য মাত্রা পায়। অনেকটা মহারাষ্ট্রের গণপতি বিসর্জনের শোভাযাত্রার মতো ছবি তৈরি হয়। কোথাও কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা বা অরাজকতা চোখে পড়ে না। ইতিহাস-নির্ভর ৫০০ বছরের বেশি দিনের এই পুজোয় মণ্ডপ বা প্রতিমার কোনও পরিবর্তন নেই। নতুন কোনও বাড়তি আকর্ষণও নেই। প্রাচীন রীতিতেই, একই উপচারে পুজো হয়। তবু আকর্ষণ কমেনি এতটুকু।

ব্যক্তিত্বময়ী এই দেবীকে দেখলে সাহসের সঞ্চার হয় মনে। প্রতিটি নারীই তো কোনও না কোনও ভাবে দুর্গাই! দশ হাতের প্রকরণ আসলে শক্তির রূপক। নিরঞ্জনের দিন সিঁদুরের রঙে আরও রাঙা হয়ে ওঠা দেবীর মুখ যেন সারা বছরের জন্য সাহস আর শক্তির সঞ্চার ঘটায় সবার মনে। এই পুজো ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং উত্তরবঙ্গের স্বকীয়তার উজ্জ্বল পরিচয়।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)