থিমের পুজোর সঙ্গে পাল্লা বনগাঁর জমিদারবাড়ির আভিজাত্যের

সীমান্ত মৈত্র

০১ অক্টোবর, ২০১৯, ১৩:৪৪
শেষ আপডেট: ০১ অক্টোবর, ২০১৯, ১৩:৫৫

স্বপ্নে দেখা দেবী মূর্তির আদলে মূর্তি গড়ে পুজো চালু করেছিলেন গৌরহরি বন্দ্যোপাধ্যায়।


জমিদারি হারিয়েছে বহু দিন আগেই। কোথাও একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়েছে। আর্থিক জোরও আগের মতো নেই। স্বাভাবিক ভাবেই তার প্রভাব পড়েছে দুর্গা পুজোর আয়োজনে। জাঁকজমক কমেছে। কিন্তু বন্ধ হয়নি পুজো। আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে যুঝেই বাড়ির পুজো ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কর্তারা।
 
এলাকায় এলাকায় বেড়েছে আধুনিক থিম পুজোর সংখ্যা। আধুনিকতা ও থিম পুজোর মিশে বারোয়ারি পুজো আজ অনেকটাই পিছনে ফেলে দিয়েছে বাড়ির পুজোকে। মানুষ রাত জেগে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দেখতেই বেশি পছন্দ করেন। তবে প্রবীণ মানুষদের কাছে জমিদার বাড়ি বা পারিবারিক পুজোর ঐতিহ্য এখনও সমান আগ্রহের বিষয়। তরুণ প্রজন্ম অবশ্য এতটা আগ্রহী নন। বনগাঁ মহকুমায় বাড়ির পুজোগুলোর মধ্যে বন্দ্যোপাধ্যায়, দত্ত, সিংহ, দাঁ, চৌধুরী বাড়ির পুজো অন্যতম। গোবরডাঙার প্রসন্ন মুখোপাধ্যায় বাড়ির পুজোও যথেষ্ট পুরনো। অশোকনগরের ধর বাড়ির পুজোও উল্লেখযোগ্য।
 
গাইঘাটার ইছাপুরের চৌধুরীদের জমিদারি এখন আর নেই। আর্থিক অনটনের সঙ্গে লড়াই করে ইছাপুরের জমিদারদের উত্তরসূরীরা ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। এক সময়ে ঘটা করে পুজো করত এই পরিবার। এখন  কমে গিয়েছে জৌলুসও। তবু চারশো বছরেরও বেশি পুরনো ওই পুজোকে ঘিরে এলাকার মানুষের উৎসাহ এতটুকু কমেনি। এলাকায় মানুষ দুর্গা পুজো বলতে চৌধুরী বাড়ির পুজোই বোঝেন। বৈষ্ণব ধর্মশাস্ত্রের বিশিষ্ট পণ্ডিত রাঘব সিদ্ধান্ত বাগীশ ইছাপুরে চৌধুরী জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা। এলাকার মানুষেরা জানালেন, ‘চৌধুরী’ তাঁরা পেয়েছিলেন সম্রাট আকবরের কাছ থেকে। রাঘবের পৌত্র রঘুনাথ চৌধুরী আনুমানিক ১৬০০ সালে ইছাপুরে দুর্গা পুজো শুরু করেন। তারপর থেকে তা বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। মহালয়ার পর দিন থেকেই শুরু হয় পুজো। প্রথমে ঘটপুজো। যষ্ঠীতে দেবীর বোধন। দশমীতে দেবীর বিসর্জন হয় যমুনা নদীতে। প্রথমে মোষ বলি দেওয়া হত। পরে একটা সময় ১০১টা পাঁঠা বলি দেওয়ার নিয়ম ছিল। এখন অবশ্য কোনও বলি দেওয়া হয় না।
 
প্রায় তিনশো বছরের বেশি সময় আগেকার কথা। স্বপ্নে দেখা দেবী মূর্তির আদলে মূর্তি গড়ে পুজো চালু করেছিলেন গৌরহরি বন্দ্যোপাধ্যায়। বনগাঁর ছয়ঘড়িয়া এলাকার মানুষের কাছে বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজো ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির পুজো হিসাবে পরিচিত। গৌরহরিবাবু ছিলেন রাখালদাসের ছোট ঠাকুরদা। একটা সময়ে ওই পুজোর নামডাক ছিল। অতীতের গরিমা এখন হয় তো আর নেই। কিন্তু আভিজাত্যে ও ঐতিহাসিক গুরুত্বে ওই পুজোর আজও মানুষের কাছে সমান আকর্ষণের। একচালার দেবী প্রতিমা এখানে পূজিত হন বিড়াল-হাত দুর্গা হিসাবে। দুর্গার প্রমাণ মাপের দু’টি হাত রয়েছে। এ ছাড়া, দু’কাঁধের উপর থেকে দু’দিকে ছোট ছোট আটটি হাত রয়েছে। সেগুলির আকার বিড়ালের থবার মতো। সে কারণেই এখানকার দুর্গা বিড়াল-হাত দুর্গা নামেও খ্যাত। মহালয়ার পরে প্রতিপদে বসানো হয় চণ্ডীর ঘট। ষষ্ঠীতে বাড়ির ভিতরে থাকা জোড়া শিব মন্দিরের নীচে বেলতলায় হয় দেবীর বোধন। পুজোর দিনগুলিতে চলে চণ্ডীপাঠ। রাখালদাসবাবু এই বাড়িতে বাস না করলেও পুজোর সময়ে আসতেন। প্রতি বছর বিজয়া দশমীর দিন আকাশে প্রথম সন্ধ্যা তারা উঠলেই প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় স্থানীয় নাওভাঙা নদীতে।
 
গোবরডাঙার প্রসন্ন মুখোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গা পুজো তিনশো বছরেরও বেশি পুরনো। যা এলাকার মানুষের কাছে জমিদার বাড়ির দুর্গা পুজো হিসাবেই পরিচিত। এলাকায় থিম পুজোর সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু গোবরডাঙা সংলগ্ন এলাকার মানুষ প্রসন্ন মুখোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গা পুজো দেখার জন্য একটি দিন তুলে রাখেন। ওই পরিবারের পূর্বপুরুষেরা প্রায় সাড়ে চারশো বছরেরও বেশি সময় আগে লখনউ থেকে এসে বাংলাদেশে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই পুজোর সূচনা। ওই পরিবারের সদস্য শ্যামরাম পরে গোবরডাঙার ইছাপুরে এসে ওখানকার জমিদার চৌধুরী পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেন। সেই সূত্রে তিনি জমিদারির একাংশ পান। তাঁর ছেলে খেলারাম ব্রিটিশ কালেক্টরের হয়ে কাজ করতেন। এখানে দেবী দুর্গা প্রসন্নময়ী দুর্গা নামে খ্যাত। খেলারাম বাড়ির পাশেই প্রসন্নময়ী কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিপদে ওই কালী মন্দিরে ঘট স্থাপন করা হয়। সপ্তমীর দিন ওই ঘট আনা হয় বাড়িতে। অতীতে ষষ্ঠীর দিন জমিদার বাড়িতে কামান দাগা হত। এলাকার মানুষ বুঝতে পারতেন, পুজো শুরু হল জমিদার বাড়িতে। অতীতে বিসর্জনের শোভাযাত্রায় হাতিও থাকত।
 
মহিষাসুর অনুপস্থিত। অষ্টমীতে দেবী দুর্গার সামনেই পূজিত হন কালী। দেবী এখানে দ্বিভূজা। হাতে নেই কোনও অস্ত্র। কোলে গণেশ। দুই মেয়ে পাশে থাকলেও ছেলে কার্তিক গরহাজির থাকেন। অশোকনগরের ধর বাড়ির দুর্গা পুজোতে এমনই সব বহু অভিনব সমাবেশ। পুজোর বয়স আড়াইশো পেরিয়েছে। জমিদার কাশীনাথ ধর ওই পুজোর সূচনা করেছিলেন। ষষ্ঠীতে পুঁথি পুজো দিয়ে উৎসবের শুরু হয় এখানে।
 
বনগাঁ শহরে ট’বাজার এলাকায় দাঁ বাড়ির দুর্গা পুজোয় দেখা যাবে কমলেকামিনী দুর্গা হাত ধরে জল থেকে টেনে তুলছেন শ্রীমন্তকে। শ্রীমন্ত পৌরাণিক কাহিনীর এক চরিত্র। জাহাজে চড়ে বাণিজ্য করতে গিয়েছিলেন। প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে জাহাজ জলে ডুবে যায়। ডুবে যাচ্ছিলেন শ্রীমন্তও। সে সময়ে মা কমলেকামিনী হাত ধরে তাঁকে টেনে তোলেন। দাঁ বাড়িতে দেবী কমলেকামিনী অভয়া দুর্গা হিসাবে পরিচিত। প্রায় দু’শো বছরেরও আগে হুগলির বৈঁচিতে এই পুজোর সূচনা হয়।
 
পরবর্তী কালে কৃষ্ণচন্দ্র দাঁ গোপালনগরে এই পুজো শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ট’বাজার এলাকায় পুজো হয়েছে। প্রতি বছর উল্টো রথের দিন মায়ের কাঠামোতে সিঁদুর দিয়ে শুরু হয় প্রতিমা গড়ার কাজ। বিসর্জনের আগে বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে দেবীকে সাতবার দোলানো হয়। সে সময়ে বাড়ির সকলে প্রতিমা লক্ষ্য করে গুড় ও চাল ছোড়েন। ইছামতীতে বিসর্জনের আগে একটি পাত্রে জল রেখে দর্পণে মায়ের চরণ দর্শন করা হয়।
 
বনগাঁর দত্ত পাড়ায় দত্ত বাড়ির পুজো আড়াইশো বছর ছাড়িয়েছে। অতীতে প্রতিমা বিসর্জনের আগে নীলকন্ঠ পাখি ওড়ানো হত এবং গুলি ছোড়া হত। সে সব এখন অতীত। দেবী একবার স্বপ্নে আদেশ দেন, হাতের ভার আর তিনি বহন করতে পারছেন না। তারপর থেকে দু’টি বড় হাতের সঙ্গে ছোট আটটি হাত করা হয়। যা দর্শনার্থীরা দেখতে পারবেন না। ঢাকা থাকে চুল ও অলংঙ্কার দিয়ে।
 
বনগাঁর সিংহ বাড়ির পুজো তিনশো ছাড়িয়েছে। গিরিশ চন্দ্র সিংহ ওই পুজোর সূচনা করেন। অতীতে প্রাণী বলি দেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও একশো বছর আগে থেকে কুমড়ো বলি দেওয়া শুরু হয়েছে।
 
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাকচিক্য কমেছে অনেক পারিবারিক পুজোর। কিন্তু ঐতিহ্য ও নিষ্ঠায় এখনও  উজ্জ্বল জমিদার বাড়ির পুজো।